যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ইতোমধ্যে ‘অনেকভাবে জয়ী হয়েছে’, কিন্তু তা ‘যথেষ্ট নয়’ বলে মনে করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে শিগগিরই ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেওয়া থেকে শুরু করে রিপাবলিকান সম্মেলনে বক্তৃতা দেওয়া এবং আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিং—সব জায়গায়ই ইরানকে নিয়ে মন্তব্য করতে ব্যস্ত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডন্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ পর্যন্ত ট্রাম্প অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’ বা ইরান অভিযান নিয়ে তার পরিকল্পনা সম্পর্কে তেমন বিশদ কিছু জানাননি। তবে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতির অগ্রগতিতে তিনি স্পষ্টতই সন্তুষ্ট মার্কিন সেনাবাহিনীর সক্ষমতা ও এ পর্যন্ত তাদের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের ইসরায়েলি অংশীদারদের সঙ্গে আমরা শত্রুকে চূর্ণ করছি, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও সামরিক শক্তির এক অভাবনীয় প্রদর্শনের মাধ্যমে।’
যুদ্ধ এই সপ্তাহে শেষ হবে না, তবে ‘খুব শিগগিরই’
মার্কিন সেনাবাহিনীর ইরানে ‘অভিযান’ কতদিন চলবে—এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, এ অভিযান ‘শিগগির’ শেষ হবে, তবে এই সপ্তাহে নয়।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি শিগগিরই। ইরানের যা কিছু ছিল সব শেষ হয়ে গেছে, তাদের নেতৃত্বসহ। যাকে (আয়াতুল্লার স্থলাভিষিক্ত) হিসেবে তারা বলছে, অধিকাংশ মানুষ তার নামই শোনেনি।’
একইসঙ্গে তিনি এটাও বলেন, ইরানে ‘যথেষ্ট জয়’ পায়নি যুক্তরাষ্ট্র। ফ্লোরিডায় তিনি সাংবাদিকদের সামনে এটাও বলেন, যুদ্ধ ‘খুবই পূর্ণাঙ্গ, প্রায় শেষের দিকে। আমরা একটি ছোট্ট অভিযান চালিয়েছি। কারণ কিছু খারাপ জিনিস সরিয়ে ফেলতে আমাদের তা করতে হয়েছে। তারপর আপনারা দেখবেন, এটি খুব স্বল্পমেয়াদি অভিযান হবে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ‘আমরা অনেকভাবে ইতোমধ্যে জয়ী হয়েছি, কিন্তু যথেষ্ট নয়। আমরা আরও দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে যাচ্ছি চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের দিকে, যা এই দীর্ঘস্থায়ী হুমকির চিরসমাপ্তি ঘটাবে।’
ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ইরানের সর্বোচ্চ সামরিক নেতা কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘সে বেঁচে থাকলে তারা আরও অনেক বেশি সক্ষম হতে পারত। কারণ তারা সক্ষম ছিল—নিষ্ঠুর, হিংস্র ও সক্ষম। কিন্তু আমরা প্রথমেই তাকে সরিয়ে দিয়েছিলাম।’
ইরানে নেতৃত্ব পবির্তনের কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। তবে কাকে ক্ষমতায় আনতে চান সে ব্যাপারে তিনি স্পষ্ট কিছু বলেননি আগে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার দাবি করার পর যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, যেই তার স্থলাভিষিক্ত হবে তাকেই টার্গেট করা হবে।
ট্রাম্প সোমবার বলেন, ‘এখন কেউই ধারণা করতে পারছে না, দেশটিতে (ইরানে) কারা নেতৃত্বে আসছে’। এর মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত করছেন, সম্ভবত তিনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না, কিংবা বিমান হামলা কিছুটা শিথিল করতে ইচ্ছুক।
ইরান নিয়ে কংগ্রেসের রিপাবলিকানদের কী বললেন ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লোরিডায় তার দল রিপাবলিকান পার্টির একটি সম্মেলনে কংগ্রেসের রিপাবলিকানদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে তিনি তার এজেন্ডা থেকে এক ধরনের ছোট্ট অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেন।
ট্রাম্প বলেন, তিনি ইরানে প্রথম হামলার নির্দেশ দেন, কারণ ‘এক সপ্তাহের মধ্যেই তারা (ইরান) যুক্তরাষ্ট্রে আক্রমণ করতে যাচ্ছিল। তাদের কাছে এত ক্ষেপণাস্ত্র ছিল, যা কেউ ভাবেনি।’
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ ব্যবস্থা ও নৌবাহিনীর ৮০ শতাংশ ধ্বংস করেছে। যুক্তরাষ্ট্র অনেক বিজয় অর্জন করলেও সামনে আরও অর্জন বাকি আছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, আমরা অনেকভাবে ইতোমধ্যে জয়ী হয়েছি, কিন্তু যথেষ্ট নয়। আমরা আরও দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগোবো—চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের জন্য, যা এই দীর্ঘস্থায়ী হুমকির চিরসমাপ্তি ঘটাবে।’
তিনি স্বীকার করেন, যুদ্ধ অর্থনীতিতে কিছু প্রভাব ফেলছে। তিনি বলেন, শেয়ারবাজার, যা নিচে নেমেছে, ‘এখন আমরা যে কাজ করছি তা শেষ হলেই অনেক বেশি ওপরে উঠবে…আমাদের সত্যি কোনো বিকল্প ছিল না।’
রিপাবলিকানদের সঙ্গে কথা বলার পর ট্রাম্প সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের উদ্দেশে কথা বলেন। সেখানে তিনি শুরুতেই বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘বড় অগ্রগতি’ অর্জন করেছে এবং মিশন ‘প্রায় সম্পূর্ণ’।
ইরানের ‘প্রতিটি বাহিনী সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দিয়েছি’ মন্তব্য করে ট্রাম্প জানান, এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ড্রোন তৈরির কেন্দ্র, ইরানের নৌক্ষমতা ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার মূল স্থাপনাগুলো। তিনি বলেন, ‘তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এখন প্রায় ১০ শতাংশ অথবা তারও কম।’
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার বিষয়ে ইরানকে প্রেসিডেন্টকে সতর্কবার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি একটি অনলাইন বিবৃতিতে বলেছেন, ‘যদি ইরান এমন কিছু করে, যা হরমুজ প্রণালিতে তেলের প্রবাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে তারা এখন পর্যন্ত যতটা আঘাত পেয়েছে তার চেয়ে বিশ গুণ বেশি আঘাত পাবে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে।’
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে যায় এবং যুদ্ধের ফলে সমুদ্র পরিবহন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বেড়ে গেছে। ট্রাম্প বলেন, ‘এ ছাড়া আমরা সহজেই ধ্বংসযোগ্য লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করব, যার ফলে ইরানের পক্ষে আবারও একটি জাতি হিসেবে গড়ে ওঠা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে, মৃত্যু, আগুন ও ক্রোধ তাদের উপর রাজত্ব করবে। তবে আমি আশা করি ও প্রার্থনা করি, এটি যেন না ঘটে!’
অন্যদিকে যুদ্ধ ‘শিগগিরই শেষ হবে’—ট্রাম্পের এমন ইঙ্গিতের পর তেলের দাম কমেছে। মঙ্গলবার সকালে এশিয়ায় লেনদেনে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম কমেছে। ব্রেন্ট প্রায় সাড়ে আট শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৯২.৫০ ডলার হয়েছে। মার্কিন বাণিজ্যের তেলও প্রায় ৯ শতাংশ কমে ৮৮.৮০ ডলার হয়েছে প্রতি ব্যারেল। তবে সংঘাতের শুরুর তুলনায় দাম এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।
১০ দিন পরও যুদ্ধের কোনো শেষ দেখা যাচ্ছে না
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর ১০ দিন পর সংঘাতের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে এর প্রভাব পড়েছে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে।
ইরানি কর্মকর্তারা নিহত সর্বোচ্চ নেতার ছেলেকে তার উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেছেন। তবে মোজতবা খামেনিকে ট্রাম্প সমর্থন দিচ্ছেন না বলে ইঙ্গিত করেছেন। ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, ইরানের নতুন নেতা নির্বাচনে তিনি ভূমিকা রাখতে চান।
ট্রাম্প যুদ্ধকে তার নীতি-অগ্রাধিকার থেকে ‘একটি অভিযান’ হিসেবে উল্লেখ করেন, তবে বলেন—এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি মনে করেন ইরান আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আক্রমণ করতে যাচ্ছিল। তবে প্রেসিডেন্ট দেশে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব স্বীকার করে বলেন, পতনশীল শেয়ারবাজার দ্রুতই ঘুরে দাঁড়াবে এবং মার্কিন কর্মীদের মৃত্যুও এড়ানো সম্ভব ছিল না।
তার এই মন্তব্য আসে এমন দিনে, যেদিন তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেন এবং একই সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনী যুদ্ধ শুরুর পর সপ্তম সদস্যের মৃত্যুর বিষয়টি প্রকাশ করে। মোট মার্কিন মৃত্যুর সংখ্যা আটে পৌঁছেছে।