যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন বাহিনী দিয়ে হামলা চালানোর পরের দিনগুলোতে দেখা যাচ্ছে, এই হামলার প্রতি জনসমর্থন আগের অনেক বিদেশি সংঘাতের শুরুর সময়কার তুলনায় অনেক কম।
এ পর্যন্ত প্রকাশিত জরিপগুলোতে দেখা গেছে, বেশির ভাগ মার্কিন নাগরিক ইরানের ওপর হামলার বিরোধিতা করছেন। রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে সমর্থন ২৭ শতাংশ, আর ফক্স নিউজের এক জরিপে তা ৫০ শতাংশ। এই বড় পার্থক্য ইঙ্গিত দেয়, হামলার বিস্তারিত ও এর পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও বেশি মার্কিন নাগরিক জানার সঙ্গে সঙ্গে জনমত এখনো গঠনের পর্যায়ে রয়েছে।
তবে এই সংঘাতের পক্ষে জনসমর্থনের সর্বোচ্চ হারও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, কোরীয় যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধসহ বেশির ভাগ বড় সংঘাতের শুরুর সময়কার সমর্থনের তুলনায় অনেক কম। পার্ল হারবারে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলার পর এবং এরপর জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পরের দিনগুলোতে গ্যালাপের তথ্য অনুযায়ী ৯৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক সেই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন। আর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আফগানিস্তানে সেনা পাঠানোর পরের দিনগুলোতে গ্যালাপের এক জরিপে ৯২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে ছিলেন।
অন্যদিকে ইরাক যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত যতই অজনপ্রিয় হয়ে উঠুক না কেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরের দিন নেওয়া এক জরিপে ৭৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন। এ ছাড়া পার্সিয়ান গালফ যুদ্ধে ৮২, পানামা যুদ্ধে ৮০, কোরীয় যুদ্ধে ৭৫, কসোভো যুদ্ধে ৫৮, গ্রেনাডা যুদ্ধে ৫৩ ও লিবিয়ায় অভিযানে ৪৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের সমর্থন ছিল।
লয়োলা ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সারা ম্যাক্সের মতে, সমর্থনের এই পার্থক্যের একটি কারণ হলো—আগের প্রেসিডেন্টরা যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে জনসাধারণকে বোঝাতে সময় নিয়েছিলেন।
যুদ্ধ ও বিদেশি সংঘাত সম্পর্কে জনমত নিয়ে গবেষণা করা ম্যাক্সে বলেন, ‘২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের আগে পুরো এক বছর ধরে বলা হয়েছিল, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ, কেন অন্য সব বিকল্প শেষ হয়ে গেছে এবং কেন এটি প্রয়োজন। স্পষ্ট কোনো যোগাযোগ কৌশল ছাড়া খুব কম বিদেশি সংঘাতই আমরা দেখেছি।’
তবে এর পেছনে আরও বড় কিছু কারণও কাজ করছে। সাধারণত যুদ্ধের শুরুতে প্রেসিডেন্টরা যে বিষয়টির মুখোমুখি হন, গবেষকেরা সেটিকে ‘র্যালি অ্যারাউন্ড দ্য ফ্ল্যাগ এফেক্ট’ বলে অভিহিত করেন—যেখানে যারা সাধারণত প্রেসিডেন্টকে সমর্থন করেন না, এমনকি তারাও সাময়িকভাবে সমর্থন জানাতে শুরু করেন।
কিন্তু গত ৩০ বছরে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং মার্কিন নাগরিকরা রাজনৈতিকভাবে আরও বিভক্ত হয়ে পড়ায় সেই প্রভাব কমে গেছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে জনমত বিষয়ে গবেষণা করেন অধ্যাপক ম্যাথিউ বাউম। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের বিপক্ষ দলের মানুষরাই সাধারণত এই র্যালির বড় উৎস হয়ে থাকেন। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের পেছনে এসে দাঁড়াবেন না। এই প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে তার সমর্থকদের কাছ থেকে যে সমর্থন পাওয়া যায়, তারাও অনেকেই মনে করেন, তাকে নির্বাচিত করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ থেকে বের করে আনার জন্য।’
সাধারণত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের প্রতি সমর্থন কমতে থাকে, যখন হতাহতের সংখ্যা বাড়ে এবং মার্কিন নাগরিকরা যুদ্ধের খরচের বাস্তবতা অনুভব করতে শুরু করেন।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের শুরুর দিকে ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করতেন না যে যুদ্ধটি ভুল ছিল। কিন্তু হতাহতের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনমনে সন্দেহও বাড়তে থাকে। ১৯৬৯ সালে এসে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বলেছিলেন, যুদ্ধটি একটি ভুল ছিল। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, এই সংখ্যা ততই বেড়েছে। (সংঘাতের একেবারে শুরুতে ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে জনসমর্থনের কোনো জরিপ ছিল না।)
ইরাক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও খুব দ্রুত জনসমর্থন কমে যায় এবং শেষ পর্যন্ত মাত্র ৪৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক যুদ্ধটিকে সমর্থন করছিলেন। তবে এই সমর্থন কমে যাওয়ার ঘটনা দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যেই দেখা গিয়েছিল। কিন্তু জাতীয় ঐক্যের সেই দিনগুলো এখন অনেকটাই অতীত। অধ্যাপক বাউম বলেন, ‘একসময় বলা হতো—দেশের সীমানা পেরোলেই রাজনীতি থেমে যায়। এখন আর তা সত্য নয়।’