দ্য হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে শনিবার (২৮ মার্চ) ইরানে সবচেয়ে বেশি হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ওই দিন সন্ধ্যা ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ইরানজুড়ে অন্তত ৭০১টি হামলা রেকর্ড করা হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, এক মাস আগে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এক দিনে এত বেশি হামলা খুব কমই দেখা গেছে এবং এই হামলাগুলোর মধ্যে ৭৪ শতাংশই হয়েছে দেশটির রাজধানী তেহরানে। এ ছাড়া তাদের হিসাবে, এখন পর্যন্ত এই সংঘাতে ১ হাজার ৫৫১ জন ইরানি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ২৩৬টি শিশু রয়েছে।
অন্যদিকে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা ইসরায়েলে দ্বিতীয় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। দেশটির আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সমর্থিত সরকার এর নিন্দা করে বলেছে, ইরান দেশটিকে যুদ্ধে জড়াতে চাইছে।
যদি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে থাকা বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হুতি হামলা চালায়, তাহলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য আরেকটি বড় আঘাত হবে।
এদিকে লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় তিনজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তবে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, নিহতদের একজন হিজবুল্লাহর আল-মানার টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক ছিলেন, তিনি আসলে ইরান সমর্থিত ওই সশস্ত্র গোষ্ঠীর একজন সদস্য ছিলেন।
স্থল অভিযানের প্রস্তুতি পেন্টাগনের
ইরানে স্থল অভিযানের জন্য পেন্টাগন কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট। তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব পরিকল্পনায় অনুমোদন দেবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে এমন খবর দিয়েছে পত্রিকাটি।
পত্রিকাটির এক খবরে বলা হয়েছে, পেন্টাগনের এই পরিকল্পনা পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ নয়, বরং বিশেষ বাহিনী ও সাধারণ পদাতিক সেনাদের নিয়ে ছোট ছোট অভিযান চালানো হতে পারে।
ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের চার হাজারের বেশি মেরিন সেনাকে জাহাজে করে উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্যারাট্রুপারদের প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং আরও সেনা পাঠানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে।
বিবিসি এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার হুমকি
বিবিসি ফার্সির সিনিয়র রিপোর্টার ঘোনশেহ হাবিবিয়াজাদ লিখেছেন, তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের ইসরায়েলি ও আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে লক্ষ্য করার হুমকি দিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। তারা বলেছে, ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তাদের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা না হওয়া পর্যন্ত এই অঞ্চলের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে বৈধ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করবে তারা।
এক বিবৃতিতে তারা আরও বলেছে, ‘আমরা এই অঞ্চলের মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কর্মকর্তা, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এবং আশপাশের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার জন্য এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্তত এক কিলোমিটার দূরে থাকার পরামর্শ দিচ্ছি।’
যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর বোমা হামলার নিন্দা জানাতে হবে, না হলে এই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাল্টাহামলা হতে পারে। এ জন্য স্থানীয় সময় মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত সময়সীমা দেওয়া হয়েছে বলে ওই বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
হুতির দ্বিতীয় হামলার দাবি
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা বলেছে, তারা দক্ষিণ ইসরায়েলের কিছু এলাকায় দ্বিতীয়বার হামলা চালিয়েছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি বলেছেন, ইসরায়েলের ‘কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা’ লক্ষ্য করে তারা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের একাধিক হামলা চালিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে একই সময়ে এই সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে এবং তারা সফলভাবে ‘তাদের লক্ষ্য অর্জন করেছে’। পাশাপাশি তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ‘শত্রু তাদের হামলা ও আগ্রাসন বন্ধ না করা পর্যন্ত’ সামনের দিনগুলোতেও আরও হামলা চালানো হবে।
তার টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে দেওয়া এই বিবৃতি এসেছে এমন সময়, যখন ইসরায়েলি ও মার্কিন গণমাধ্যমে হুতির দ্বিতীয় দফা হামলার খবর প্রকাশিত হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই হুতি নিশ্চিত করেছিল, ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর তারা প্রথমবারের মতো ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তারপর ইসরায়েল জানিয়েছে, ইয়েমেন থেকে ছোঁড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে।
জর্ডানে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে হামলার হুমকি
ইরাকে সক্রিয় থাকা ইরানপন্থী একটি মিলিশিয়া গোষ্ঠী জানিয়েছে, তারা জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বার্থকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করবে। ‘আসহাব আল-কাহফ’ নামের এই গোষ্ঠীটি টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা তাদের অভিযান দ্রুত বাড়াচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে যুক্তরাষ্ট্র-সম্পর্কিত স্থাপনা থেকে দূরে থাকতে বলেছে।
এই মিলিশিয়া গোষ্ঠীটি গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের ঘাঁটি, পাশাপাশি ইরাকে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে অনেকগুলো রকেট হামলার দায় স্বীকার করেছে।
জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধের চতুর্থ সপ্তাহে ইরান তাদের দিকে ২২টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছিল, যার মধ্যে ২০টি তারা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রা নিউজ এজেন্সি সামরিক সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে। তাদের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সংঘাত শুরুর পর থেকে জর্ডানের বিমানবাহিনী মোট ২৪২টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করেছে, তবে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অন্তত ২০টি হামলা ঠেকাতে পারেনি।