তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় সোমবার (৬ এপ্রিল) ভোর থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে তেহরানের শরিফ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও এর একটি গ্যাস স্টেশনও ছিল। হামলার পর পাওয়া ছবিতে তেহরানের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে প্রচণ্ড ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। বিবিসি ফার্সি এসব তথ্য জানিয়েছে।
অন্যদিকে তেহরানের ৯ নম্বর জেলার মেয়র ঘোষণা করেছেন, সোমবার সকালে শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গ্যাস স্টেশনে হামলার পর শরিফ এলাকার গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই হামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব এলাকা আক্রান্ত হয়েছে, তার মধ্যে ইনফরমেশন টেকনোলজি সেন্টার ভবন ও বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদও রয়েছে। এ ছাড়া সোমবার সকালে প্রকাশিত ছবিতে তেহরানের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘন ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার শিকার হয়েছে।
ভাহিদ অনলাইনকে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় রাত ১টার দিকে একদল যুদ্ধবিমান বোরোজের্দ শহরের ওপর দিয়ে নিচু উচ্চতায় উড়ে যায়। সেখানকার একজন অধিবাস বলেন, ‘প্রতিদিন রাতেই আমরা কয়েকটি যুদ্ধবিমানের শব্দ শুনি, কিন্তু আজ রাতে এই শব্দ অন্তত পাঁচ গুণ বেশি ছিল।’
শিরাজ শহরে সোমবার সকালে শক্তিশালী বিস্ফোরণের খবর এবং যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনার বিষয়েও খবর পাওয়া যাচ্ছে। কওম শহরের কয়েকজন বাসিন্দাও জানিয়েছেন, সোমবার রাত ১টার দিকে শহরের কিছু এলাকাকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
কওম প্রদেশের উপ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিচালকও জানিয়েছেন, শহরের একটি আবাসিক এলাকা হামলার শিকার হয়েছে। তিনি নাগরিকদের ঘটনাস্থলে ভিড় না করার অনুরোধ করেছেন।
ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি
অন্যদিকে ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দেশটির রাজকীয় বিমান বাহিনী ‘একাধিক ইরানি ড্রোন’ ভূপাতিত করেছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ব্রিটিশ টাইফুন ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পূর্ব ভূমধ্যসাগর, জর্ডান, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশে প্রতিরক্ষামূলক অভিযান চালিয়ে যাবে। এসব অভিযানে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের ভয়েজার ট্যাংকার বিমান এবং রয়্যাল নেভির মার্লিন ও ওয়াইল্ডক্যাট হেলিকপ্টার সহায়তা দিচ্ছে।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ‘এ অঞ্চলে বাহিনীর সুরক্ষা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং যুক্তরাজ্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছ।’
ইরানের সঙ্গে ওমানের আলোচনা
হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে ‘নিরবচ্ছিন্ন নৌযান চলাচল নিশ্চিত করার’ উপায় নিয়ে আলোচনার জন্য ইরানের সঙ্গে বৈঠকের কথা জানিয়েছে ওমান।
দেশটি বলেছে, ওই বৈঠকে উভয় পক্ষের বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন মতামত ও প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন, যা এখন পর্যালোচনা করা হবে।
এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে ‘নৌপরিবহন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে’ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘যেকোনো প্রচেষ্টায়’ তারা অংশ নিতে প্রস্তুত।
তিনি আরও বলেছেন, যুদ্ধের সময় ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবস্থান ও প্রভাব আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে তারা বিশ্বাস করেন।
বাড়ছে তেলের দাম
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি করার জন্য ইরানকে মঙ্গলবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়ার পর সোমবার তেলের দাম বাড়তে দেখা যাচ্ছে। ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার ইরানের উদ্দেশে হুমকি দিয়ে বলেছেন, মঙ্গলবার ইরানে সব কিছু গুড়িয়ে এক করে দেওয়া হবে।
তিনি অবশ্য ফক্স নিউজকে বলেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং তিনি বিশ্বাস করেন সোমবারের মধ্যে তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্ভব। ইরান অবশ্য বারবার জোর দিয়ে বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি।
এরপর সোমবার সকাল নাগাদ তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। দিনের শুরুর লেনদেনে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ক্রুড তেলের দাম ১.৮৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৩.৬২ ডলারে পৌঁছেছে। নর্থ সি ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দামও সপ্তাহের শুরুতে বেড়েছে, যা ১.১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ১১০.৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন ষষ্ঠ সপ্তাহে প্রবেশ করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিকে বিঘ্নিত করছে। ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। ফলে বেড়ে যাচ্ছে তেলের দাম।