আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে দৃশ্যপট কীভাবে ভোজবাজির মতো বদলে যায়, ইসলামাবাদ এখন তার জীবন্ত উদাহরণ। যে দেশটি এক দশক আগেও ওসামা বিন লাদেনের লুকিয়ে থাকা কিংবা ‘টেরর ফিন্যান্সিং’-এর অভিযোগে ধূসর তালিকায় পড়ে হাসফাস করছিল, ১০ এপ্রিল সেই শহরের রেড জোন এলাকা অবরুদ্ধ করা হয়েছে বিশ্বশান্তির এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ রচনার জন্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মতো দুই চিরশত্রুকে এক টেবিলে বসানো—এটি কেবল পাকিস্তানের কূটনৈতিক সাফল্য নয়, বরং এক অবিশ্বাস্য ‘ইমেজ মেকওভার’।
ভারত বনাম পাকিস্তানের অন্যরকম লড়াই
এই আলোচনার আয়োজক যদি ভারত হতো, তবে বিশ্ববাসী একে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিত। কারণ নয়াদিল্লির গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব তাকে অনেক আগেই একটি ‘স্থিতিশীল মধ্যস্থতাকারী’র তকমা দিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আকাশ-পাতাল পার্থক্য। যে রাষ্ট্রটিকে পশ্চিমাবিশ্ব এতদিন ‘সমস্যার অংশ’ মনে করত, আজ তারা সেই রাষ্ট্রকেই ‘সমাধানের অংশ’ হিসেবে মেনে নিয়েছে। এটিই এই বৈঠকের সবচেয়ে বড় চমক।
এখন অনেকে মনে করতে পারেন, শান্তি আলোচনার আয়োজক হিসেবে পাকিস্তানের চেয়ে ভারতই তো এগিয়ে থাকতে পারতো। ভারত কেন এই সুযোগ লুফে নিতে পারল না? সেটি কেন হলো না?
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ভারতই ছিল এই মধ্যস্থতার জন্য সবচেয়ে যোগ্য, কারণ ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় দেশেরই চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক কিছু ‘কৌশলগত সীমাবদ্ধতা’ ভারতকে পিছিয়ে দিয়েছে এবং পাকিস্তানকে এগিয়ে দিয়েছে। এর প্রধান কারণগুলো ব্যাখ্যা করলেই বিষয়টি অনেকটা পরিষ্কার হবে।
যুক্তরাষ্ট্র জানে, ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ওপর প্রভাব রাখা জরুরি। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করেছে, ভারতকে মধ্যস্থতাকারী বানালে তা কেবল একটি কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা হবে। কিন্তু পাকিস্তানকে ব্যবহার করলে তারা ইরানের ভেতরের অনেক খবর এবং নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি হাতে পাবে। আসিম মুনিরকে ‘ফিল্ড মার্শাল’ বলে সম্বোধন করা মূলত সেই আস্থারই প্রতিফলন।
এ কারণেই ভারত এই শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ লুফে নিতে পারেনি—বলাটা হয়তো ভুল হবে, বরং ভারত সম্ভবত এই ঝুঁকিপূর্ণ মধ্যস্থতায় জড়াতে চায়নি। কারণ এই আলোচনা যদি ব্যর্থ হয়, তবে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভারতের ইমেজে দাগ পড়তে পারত। অন্যদিকে পাকিস্তান তার শেষ চাল হিসেবে এই ঝুঁকিটি নিয়েছে। তাদের জন্য এটি ছিল এক ঢিলে দুই পাখি মারা—একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেদের অপরিহার্য করে তোলা, অন্যদিকে ভারতের আঞ্চলিক কূটনৈতিক দাপটকে চ্যালেঞ্জ করা।
কীভাবে পাকিস্তানের সম্ভব হলো এই রূপান্তর?
জঙ্গিবাদ থেকে শান্তিবাদের পথে যাত্রা: একটি কূটনৈতিক জুয়া
পাকিস্তান তার গায়ে লেগে থাকা ‘জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষক’ তকমাটি মুছে ফেলার জন্য এই সুযোগটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা বিশ্বকে দেখাতে চাইছে, যারা একসময় বিচ্ছিন্নতাবাদ সামলাতে হিমশিম খেত, তারাই আজ শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিশ্বযুদ্ধের দামামা থামানোর সামর্থ্য রাখে। জে ডি ভ্যান্স বা জ্যারেড কুশনারের মতো হাই-প্রোফাইল প্রতিনিধিদের ইসলামাবাদে যাওয়া প্রমাণ করে, পাকিস্তানের ডিপ স্টেট’ বা নীতি-নির্ধারকরা তাদের পুরনো ইমেজ ঝেড়ে ফেলে বিশ্বদরবারে নতুন করে প্রাসঙ্গিক হতে পেরেছে।
হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা আর লেবাননে ইসরায়েলি হামলা যখন পৃথিবীকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের খাদের কিনারে নিয়ে গেছে, তখন ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলের এই ব্যস্ততা পাকিস্তানের জন্য এক বড় অগ্নিপরীক্ষা। বৈঠকটি সফল হলে পাকিস্তান কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ত্রাণকর্তা হবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একচেটিয়া কূটনৈতিক প্রভাবের সামনেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবে। এরমধ্যেই বৈঠকের সাফল্যের সুবাস পাওয়া যাচ্ছে। বৈঠকের পুরো ফল পেতে আমাদের যদিও অপেক্ষা করতে হবে।
তবে ফল যা-ই হোক, এ ধরণের হাইভোল্টেজ বৈঠক আয়োজন করে পাকিস্তান যে বিশ্বদৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হলো সেটিও কম নয়। যে দেশ নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় লড়ছিল, আজ সেই দেশটিই বিশ্বের শান্তি রক্ষায় আলোচনা আয়োজকের ভার নিজের কাঁধে নিয়েছে—এটাই ২০২৬ সালের ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স হিসেবে স্থান করে নিল।