ইসলামাবাদে দীর্ঘ ম্যারাথন আলোচনার পর কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ওয়াশিংটনের দাবি, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করার বিষয়ে তেহরান প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হয়নি।
এই অচলাবস্থার কারণে দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বদানকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স জানান, ২১ ঘণ্টার আলোচনা শেষেও ইরানের কাছ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র বা তা তৈরির সক্ষমতা বর্জন করার বিষয়ে কোনো ‘ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি’ পাওয়া যায়নি।
আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার মূলে পরমাণু কর্মসূচি
ভ্যান্স জানান, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল ইরানের কাছ থেকে একটি ‘মৌলিক প্রতিশ্রুতি' নেওয়া যে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের পথে হাঁটবে না। তিনি বলেন, ‘এটিই মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রধান লক্ষ্য।’
আলোচনার পুরোটা সময় তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন বলেও জানান।
ওয়াশিংটনের দাবি, দীর্ঘ আলোচনার পর তারা একটি ‘চূড়ান্ত ও সেরা প্রস্তাব' পেশ করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি।
পাল্টাপাল্টি অলঙ্ঘনীয় শর্ত এবং গভীর অবিশ্বাস
ইরান যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলোকে ‘অযৌক্তিক' বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পরমাণু কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে ওয়াশিংটনের অনমনীয় অবস্থানের কারণে আলোচনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক সপ্তাহের সংঘাতের পর গভীর অবিশ্বাসের আবহে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। তাই মাত্র এক দফার আলোচনাতেই বড় কোনো অগ্রগতির আশা করা ছিল অবাস্তব।
তেহরান কিছু অলঙ্ঘনীয় শর্তও তুলে ধরেছে, যার মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণ এবং লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ করা।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে বাড়তি চাপ
আলোচনা চলাকালে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যায়, যখন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, তাদের দুটি ডেস্ট্রয়ার (যুদ্ধজাহাজ) মাইন অপসারণ অভিযানে নিরাপত্তা দিতে সেখানে গিয়েছিল। তবে ইরান এই দাবি অস্বীকার করেছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ, যেখান দিয়ে বিশ্বের তেলের একটি বড় অংশ পরিবহন করা হয়, তা দু’পক্ষের কাছেই দরকষাকষির প্রধান হাতিয়ার ও বিবাদের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
লেবাননে সংঘাত
হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা আলোচনাকে আরও জটিল করে তোলে। লেবানন কর্তৃপক্ষের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর সেখানে এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর সঙ্গে কোনো যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে।
২১ ঘণ্টার উচ্চপর্যায়ের কূটনীতি
ভ্যান্স জানান, আলোচনার সময় তিনি একাধিকবার ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা সদিচ্ছা নিয়েই আলোচনা করছিলাম। মার্কিন প্রতিনিধিদল একটি একক প্রস্তাবের পক্ষেই ঐক্যবদ্ধ ছিল।’
চাপের মুখে যুদ্ধবিরতি
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্মত হওয়া ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সে বিষয়ে ভ্যান্স কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেননি।
পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীরা উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে এবং উত্তেজনা এড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেন, পক্ষগুলোর উচিত, যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা। সংলাপ চালিয়ে যেতে ইসলামাবাদ তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু না হলে সংঘাত আবারও তীব্র হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।
তথ্যসূত্র: এএফপি, এপি