লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম দক্ষিণ লেবাননের আল-তায়রি গ্রামে বিমান হামলায় সাংবাদিক আমাল খলিলকে হত্যা এবং তার সহকর্মী জয়নাব ফারাজকে আহত করার ঘটনায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের' অভিযোগ তুলেছেন।
বুধবার (২২ এপ্রিল) একটি গাড়িতে ইসরায়েলি হামলার খবর সংগ্রহ করার সময় তারা লক্ষ্যবস্তু হন। প্রাণ বাঁচাতে একটি ভবনে আশ্রয় নিতে যাওয়ার সময় তাদের ওপর পুনরায় হামলা চালানো হয়।
জরুরি স্বাস্থ্যকর্মীরা ফারাজকে উদ্ধার করতে পারলেও দীর্ঘ সাত ঘণ্টা পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে আমাল খলিলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সহকর্মী ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে শেষবারের মতো নিজের পরিবার ও লেবানিজ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন আমাল খলিল। যে গাড়িতে করে আমাল ও জয়নাব যাচ্ছিলেন, তার সামনেই ইসরায়েলি হামলায় দুজন নিহত হওয়ার পর তারা একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন।
লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, উদ্ধারকর্মীরা আল আখবারের এই অভিজ্ঞ সাংবাদিকের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের ওপর গুলি চালায়। তখন তারা পিছু হটতে বাধ্য হন।
এরপর দ্বিতীয় দফার হামলায় বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায়। মধ্যরাতের কিছু আগে আমালের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
আল জাজিরা জানিয়েছে, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে গত মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘাতের খবর সংগ্রহ করছিলেন আমাল খলিল।
চলতি বছরে লেবাননে নিহত নবম সাংবাদিক তিনি।
১৯৮৪ সালে দক্ষিণ লেবাননের বায়সারিয়ায় জন্ম নেওয়া আমাল ২০০৬ সাল থেকে আল আখবারে কাজ করছিলেন। তার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো মূলত লেবাননের ভেতরে ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থান এবং ঘরবাড়ি ধ্বংস করার ঘটনার ওপর আলোকপাত করে তৈরি।
এ বছরের শুরুতে দ্য পাবলিক সোর্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তার কাজ সীমান্ত এলাকার মানুষের টিকে থাকার লড়াইকে তুলে ধরা।
খলিল বলেন, ‘শত্রুপক্ষ কেবল সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার যে বয়ান দেয়, ঘরবাড়ি ও খামারে বোমাবর্ষণ এবং শিশু হত্যার তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরে আমি সেই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করি। আমার কাজের মধ্য দিয়ে আমি এই মাটির সন্তানদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার চেষ্টা করেছি।’
সাংবাদিক নিহতের এই ঘটনায় আল জাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) জানায়, আমাল খলিল হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক মহলের জন্য একটি সতর্কবার্তা হওয়া উচিত, যাতে তারা আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ এবং এই অঞ্চলে ইসরায়েলের হাতে ২৬২ জন সাংবাদিক নিহতের ঘটনার তদন্ত নিশ্চিত করে।
সিপিজের আঞ্চলিক পরিচালক সারা কুদাহ বলেন, আহতদের উদ্ধারে চিকিৎসকদের বাধা দেওয়া ইসরায়েলের একটি নিয়মিত অপরাধে পরিণত হয়েছে, যা গাজার পর এখন লেবাননেও দেখা যাচ্ছে। একজন নিরস্ত্র বেসামরিক সাংবাদিক হওয়া সত্ত্বেও আমাল সাত ঘণ্টা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে ছিলেন, কারণ রেড ক্রসকে তার কাছে পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন আমাল খলিলের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন এবং আহত জয়নাব ফারাজের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসনের সত্য গোপন করতেই পরিকল্পিতভাবে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
আল জাজিরার সাংবাদিক হেইডি পেট জানান, আমাল খলিল লেবাননে অত্যন্ত সম্মানিত একজন সাংবাদিক ছিলেন। গত বছরের যুদ্ধের সময় একটি ইসরায়েলি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে আমালকে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলা হয়েছিল, তিনি যদি বেঁচে থাকতে চান, তাহলে যেন সাংবাদিকতা ছেড়ে লেবানন ত্যাগ করেন।
এদিকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী উদ্ধারকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং দাবি করেছে, তারা সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।