দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন
শনিবার রাত তখন ১০টা ৩১ মিনিট। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের ব্রিফিং রুমে প্রবেশ করলেন। পরনে তখনও তার সান্ধ্যকালীন টাক্সিডো এবং বো-টাই। নিজের জীবনের ওপর আরও একটি হামলার চেষ্টা নিয়ে কথা বলতেই ব্রিফিং রুমে এসেছেন তিনি।
এসেই বললেন, ‘সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। এটি ছিল সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত!’
সেখানে আসার কিছুক্ষণ আগে প্রেসিডেন্ট একটি সিসিটিভি ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন, যেখানে দেখা যায়, ওয়াশিংটন হিলটন হোটেলের বিশাল হলরুমের ভেতর দিয়ে এক সন্দেহভাজন দ্রুতবেগে ছুটে পালাচ্ছে।
শনিবার সন্ধ্যায় এই হোটেলে হোয়াইট হাউসের খবর সংগ্রহ করা সাংবাদিক সমিতির বার্ষিক নৈশভোজে অংশ নেন ট্রাম্প। গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে সেখানেই।
কী ঘটেছিল, তা নিয়ে তখন পর্যন্ত অস্পষ্টতা থাকলেও প্রেসিডেন্ট নিজে এ নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী ছিলেন। ফার্স্ট লেডি, ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল, এফবিআই পরিচালক ও প্রেস সেক্রেটারিকে পাশে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ট্রাম্প। তাদের সবার পরনেই ছিল নৈশভোজের জমকালো পোশাক।
ট্রাম্প বলেন, ‘যখন এমন কিছু ঘটে, তা সবসময়ই বেদনাদায়ক হয়।’ তবে তিনি যুক্তি দিলেন, এই ঘটনা প্রমাণ করে, কেন হোয়াইট হাউসে তার সেই সর্বোচ্চ নিরাপত্তার বলরুমটি তৈরি করা প্রয়োজন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি এটি বলতে চাইনি, কিন্তু আমরা হোয়াইট হাউসে যা করার পরিকল্পনা করছি, এ কারণেই তার সব বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন। সেটি আকারে বড় এবং অনেক বেশি নিরাপদ হবে; যা ড্রোনরোধী এবং বুলেটপ্রুফ কাঁচ দিয়ে ঘেরা থাকবে।’
এরপর ট্রাম্প রাতের প্রথম প্রশ্নটি করার সুযোগ দেন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক উইজিয়া জিয়াংকে। নৈশভোজে বিশৃঙ্খলা শুরুর আগে তিনি ট্রাম্পের পাশেই বসা ছিলেন।
ট্রাম্প তাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘ম্যাডাম চেয়ারম্যান, আমি শুধু বলতে চাই, আপনি দুর্দান্ত কাজ করেছেন। কী চমৎকার একটি সন্ধ্যা ছিল!’ (সাধারণত সংবাদকর্মীদের সঙ্গে ট্রাম্পকে এভাবে কথা বলতে দেখা যায় না)।
উইজিয়া প্রশ্ন করলেন, জীবন বিপন্ন হওয়ার মুহূর্তে তার (প্রেসিডেন্টের) মনে কী চলছিল। ট্রাম্প জানান, ফার্স্ট লেডি তার পাশে বসে ছিলেন। তখন তিনি এমন এক শব্দ শোনেন, যা তার কাছে খুব সাধারণ মনে হয়েছিল।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, থালা-বাসনের ট্রে পড়ে যাওয়ার শব্দ। আমি এমন শব্দ অনেকবার শুনেছি। শব্দটা অনেক দূর থেকে আসছিল।’
তবে তার স্ত্রী মেলানিয়া এ নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন না।
ট্রাম্প ব্যাখ্যা করেন, “মেলানিয়া যা ঘটছিল, তা নিয়ে অনেক বেশি সচেতন ছিল। আমার মনে হয়, সে তাৎক্ষণিকভাবেই বুঝতে পেরেছিল। ও বলছিল, ‘এটা ভালো শব্দ নয়’।”
ব্রিফিং রুমে দাঁড়িয়ে থাকা মেলানিয়াকে তখন বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছিল। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকেরা যখন তাকে কিছু বলতে চান কি না জিজ্ঞেস করেন, মেলানিয়া শুধু একটি শব্দই বলেন, ‘না’।
প্রেসিডেন্ট জানান, তার স্ত্রীর জন্য এটি মানসিকভাবে আঘাত পাওয়ার মতো একটি অভিজ্ঞতা।
নিরাপত্তা বাহিনী তাকে যেভাবে দ্রুত সেখান থেকে সরিয়ে নিয়েছিল, তার প্রশংসা করে ট্রাম্প বলেন, ‘সেখানে চিন্তা করার মতো খুব বেশি সময় ছিল না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমরা দরজার বাইরে চলে গিয়েছিলাম।’
সামগ্রিকভাবে শনিবার রাতে ব্রিফিংয়ে ট্রাম্প ছিলেন বিস্ময়করভাবে ধীর, স্থির। একজন মানুষ, যিনি ২০২৪ সালে নির্বাচনী প্রচারের সময় দুবার হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে ফিরেছেন এবং যার স্ত্রী কিছুক্ষণ আগে টেবিলের নিচে লুকিয়ে ছিলেন, তার কাছ থেকে এমন আচরণ ছিল অপ্রত্যাশিত।
আগামী দিনগুলোতে প্রেসিডেন্টের মানসিকতা, তার রাজনৈতিক প্রবৃত্তি বা নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে। হামলাকারীর উদ্দেশ্য সম্পর্কেও এই সংবাদ সম্মেলনে খুব কম তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে ট্রাম্প বারবারই এটা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, এই ভয়ভীতি তার জীবনযাত্রায় কোনো পরিবর্তন আনবে না।
তিনি বলেন, ‘আমি এ নিয়ে না ভাবতেই পছন্দ করি। আমি বেশ স্বাভাবিক জীবনযাপন করি, অবশ্যই এটি যে ঝুঁকিপূর্ণ জীবন তা বিবেচনায় রেখেই। আমার মনে হয়, আমি বিষয়টি খুব ভালোভাবে সামলাচ্ছি।’
‘সত্যি বলতে কী, আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়িনি,’ বলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।