হরমুজ প্রণালির বিপুল জলরাশি আর মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত বদলে যাওয়া ভূ-রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে পড়ে ভারতের দীর্ঘদিনের লালিত চাবাহার স্বপ্ন আজ বড় এক প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে। ওমান উপসাগরের তীরে অবস্থিত ইরানের এই কৌশলগত বন্দরটি একসময় ভারতের জন্য ছিল আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় পৌঁছানোর এক সোনালী তোরণ। কিন্তু ২০২৬ সালের এই সময়ে এসে দেখা যাচ্ছে, সেই তোরণ দিয়ে বাণিজ্যের চেয়ে অনিশ্চয়তার হাওয়াই বেশি বইছে।
চাবাহার বন্দর হলো ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে ওমান উপসাগরের তীরে অবস্থিত দেশটির একমাত্র সামুদ্রিক গভীর সমুদ্রবন্দর। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সরাসরি ভারত মহাসাগরের সাথে সংযোগ স্থাপন করে। ভারত ও ইরানের যৌথ প্রচেষ্টায় উন্নত এই বন্দরটি মূলত পাকিস্তান ও আফগানিস্তানকে বাইপাস করে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের সাথে বাণিজ্যের একটি নিরাপদ ও সংক্ষিপ্ত ট্রানজিট পথ হিসেবে কাজ করছে, যা ভারতের জন্য ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে খুবই গুরুত্ববাহী।
ভারত ও ইরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক চাবাহার বন্দর প্রকল্পটি কেবল একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ ছিল না; এটি ছিল মূলত পাকিস্তানের করাচি ও গোয়াদর বন্দরকে এড়িয়ে মধ্য এশিয়ায় ভারতের প্রভাব বিস্তারের এক বড় চাল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে চলমান অস্থিরতা এবং ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের সরাসরি আঁচ এসে পড়েছে ভারতের এই স্বপ্নের ওপর।
হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য দীর্ঘ অবরোধের যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে, তা চাবাহার বন্দরের কার্যকারিতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ভারত গত কয়েক বছরে এই বন্দরে কোটি কোটি ডলার ঢেলেছে এবং অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো তৈরি করেছে। কিন্তু সমুদ্রপথ যদি অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তবে এই বিশাল বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যেতে পারে।
নয়া দিল্লির নীতিনির্ধারকরা এখন নতুন করে ভাবছেন চাবাহার কি সত্যিই পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরের বিকল্প হতে পারবে, নাকি এটি কেবল ভারতের একটি ব্যয়বহুল ভুল হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেবে। ভূ-রাজনীতিবিদদের মতে, চাবাহার ছিল ভারতের কানেক্ট সেন্ট্রাল এশিয়া পলিসির মূল ভিত্তি। কিন্তু রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ভারতকে এখন এক কঠিন সমীকরণের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এখানে ভারতের জন্য আরও একটি বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া। ভারত যখন চাবাহার নিয়ে বেশ ধীরগতিতে এগোচ্ছে, রাশিয়া তখন দ্রুতগতিতে ইরানের উত্তর-দক্ষিণ করিডোর বা আইএনএসটিসি-এর নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া এখন সমুদ্রপথের চেয়ে স্থলপথ ও কাস্পিয়ান সাগর কেন্দ্রিক বাণিজ্যে বেশি জোর দিচ্ছে। ভারতের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো, চাবাহার প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল আফগানিস্তানে নিজেদের পণ্য সহজে পৌঁছানো। কিন্তু বর্তমান তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে ভারতের আগের সেই প্রভাব নেই, যার ফলে চাবাহারের উপযোগিতা ভারতের কাছে অনেকটা কমে গেছে।
এর পাশাপাশি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয় তো সবসময়ই ছিল। যদিও কৌশলগত কারণে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে এই প্রকল্পে বিশেষ ছাড় দিয়েছিল, কিন্তু বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে সেই ছাড় কতদিন বজায় থাকবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ভারত একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সখ্য বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে চাবাহার চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন চাইছে, এই দ্বিমুখী নীতি সামলানো এখন দিল্লির জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
চীনও এই সুযোগে হাত গুটিয়ে বসে নেই। ইরানের সাথে চীনের দীর্ঘমেয়াদী ২৫ বছরের কৌশলগত চুক্তি চাবাহার প্রকল্পে ভারতের একক আধিপত্যকে দুর্বল করে দিতে পারে। বিশেষ করে ইরান যখন দেখছে ভারত মার্কিন চাপে কিছুটা নমনীয়, তখন তারা চীন বা রাশিয়ার দিকে আরও বেশি ঝুঁকছে।
বিশ্লেষকরা প্রশ্ন উস্কে দিচ্ছেন এই বলে যে, চাবাহার স্বপ্ন কি তবে ভারতের জন্য শেষ হয়ে গেল? অনেকে বলছেন, আসলে স্বপ্নটি এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি, তবে এটি এখন বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারত যদি দ্রুত তার পরিকল্পনা পরিবর্তন না করে এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের সঙ্গে তাল মিলাতে না পারে, তবে চাবাহার হয়তো ভারতের বড় কোনো অর্জনের বদলে এক অপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা হয়েই ইতিহাসে থেকে যাবে। যুগের দাবি মেনে ভারত যদি এই রুটকে বহুমুখী বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে নতুন করে সাজাতে না পারে, তবে সময়ের স্রোতে এই সোনালী তোরণটি হয়তো ভারতের জন্য ঐতিহাসিক আফসোস হয়ে থাকবে।
সূত্র: আল-জাজিরা, দ্য ডিপ্লোম্যাট, দ্য হিন্দুসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম