লেবাননজুড়ে প্রায় দুই বছর আগে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে হাজার হাজার পেজার বিস্ফোরিত হয়েছিল। হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে চালানো ইসরায়েলের সেই সমন্বিত হামলায় দুই শিশুসহ কমপক্ষে ৩২ জন নিহত এবং হাজারো মানুষ গুরুতর আহত হয়।
এর আগে এমন হামলা দেখেনি বিশ্ব। এখন হিজবুল্লাহ নিজস্ব এক মরণাস্ত্র খুঁজে পেয়েছে, যা নিঃশব্দে কেড়ে নিচ্ছে ইসরায়েলিদের প্রাণ।
জ্যামার দিয়ে ঠেকানো অসম্ভব যে ড্রোন
আলোচিত এই অস্ত্রটি হলো ফাইবার-অপটিক কোয়াডকপ্টার ড্রোন। ওজনে মাত্র কয়েক কেজি হলেও এটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এর আকার নয়, বরং এর নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিই একে ভয়ংকর করে তুলেছে।
প্রচলিত ড্রোনের মতো এটি ওয়্যারলেস সিগন্যালের ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি একটি ফাইবার-অপটিক ক্যাবল বা তারের মাধ্যমে সরাসরি অপারেটরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। এই একটি পার্থক্যই পুরো সমীকরণ বদলে দিয়েছে।
যেহেতু এতে কোনো রেডিও সিগন্যাল নেই, তাই একে মাঝপথে আটকানো বা ব্লক করার সুযোগ নেই। ফলে ইসরায়েলের ড্রোন-প্রতিরোধী ব্যবস্থার প্রধান ভিত্তি ইলেকট্রনিক জ্যামিং সিস্টেম এখন অকেজো হয়ে পড়েছে।
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইয়েহোশুয়া কালিস্কি সিএনএনকে বলেন, ‘এই ড্রোনগুলো কমিউনিকেশন জ্যামিং প্রতিরোধী। কোনো ইলেকট্রনিক সিগন্যাল না থাকায় এগুলো ঠিক কোথা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, তা খুঁজে বের করাও অসম্ভব।’
ক্যামেরায় ধরা পড়া প্রাণঘাতী হামলা
হিজবুল্লাহ রোববার (৩ মে) এই ড্রোন ব্যবহারের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যায়, ইসরায়েলি সেনারা তাদের দিকে ধেয়ে আসা বিপদ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র টের পাওয়ার আগেই ড্রোনটি আঘাত হানছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) নিশ্চিত করেছে, ওই আঘাতে ১৯ বছর বয়সী সার্জেন্ট ইদান ফুকস নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন সেনা।
আহতদের উদ্ধারে যখন একটি হেলিকপ্টার আসে, হিজবুল্লাহ সেটিকেও লক্ষ্য করে ড্রোন ছোড়ে।
ইসরায়েলি সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, ড্রোনের সঙ্গে যুক্ত তার ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এই তার এতটাই পাতলা ও হালকা যে খালি চোখে দেখা প্রায় অসম্ভব।
এর ফলে অপারেটর বিপদসীমার অনেক দূরে নিরাপদে বসেও লক্ষ্যবস্তুর একদম পরিষ্কার দৃশ্য লাইভ দেখতে পান।
ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে নেওয়া শিক্ষা
ফাইবার-অপটিক ড্রোনের উদ্ভাবক হিজবুল্লাহ নয়। এগুলো প্রথম বড় আকারে দেখা গিয়েছিল ইউক্রেন যুদ্ধে, যেখানে রুশ বাহিনী এটি ব্যবহার করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিল।
রাশিয়া এই প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করে ড্রোনের ক্যাবলটিকে একটি বেস ইউনিটের সঙ্গে যুক্ত করে, যা অপারেটরের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে।
ইসরায়েলি বাহিনী বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ঘাঁটির খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফলে দক্ষিণ লেবানন এবং উত্তর ইসরায়েল উভয় অঞ্চলেই হিজবুল্লাহ এই ড্রোনের সাহায্যে ইসরায়েলি সেনাদের খুঁজে খুঁজে শিকার করা শুরু করেছে।
ইসরায়েলের ধারণা, হিজবুল্লাহ চীন বা ইরান থেকে এই ড্রোনের মূল কাঠামো সংগ্রহ করে। এরপর তার সঙ্গে গ্রেনেড বা এ ধরনের বিস্ফোরক জুড়ে দেয়।
ফলাফল হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে এমন এক অস্ত্র, যা সস্তা, প্রায় অদৃশ্য এবং অত্যন্ত নিখুঁত। আকারে ছোট হলেও এটি ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর নির্ভুল হামলা চালাতে সক্ষম।