এই এক মাস আগেও মোতাব শেখের একমাত্র আশা ছিল পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় নিজের নামটুকু ফিরে পাওয়া। আজ তিনি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হওয়া দুজন প্রার্থীর একজন। ২০২১ সালে একটিও আসন না পাওয়া কংগ্রেসের জন্য তিনি যেন নতুন আশার আলো হয়ে ফিরে এলেন।
মঙ্গলবার (৫ মে) দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার পর ভোটার তালিকা থেকে ৫৮ বছর বয়সী মোতাব শেখের নাম কেটে দেওয়া হয়েছিল। নিজের অধিকার ফিরে পেতে তিনি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন।
গত ৫ এপ্রিল অর্থাৎ প্রথম দফার মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময়ের মাত্র একদিন আগে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত মোতাবের পক্ষে রায় দেন। পরদিন ৬ এপ্রিল তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কা আসন থেকে মনোনয়নপত্র জমা দেন।
গতকাল সোমবারের নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যায়, মোতাব ৬৩ হাজার ৫০ ভোট পেয়ে ৮ হাজারেরও বেশি ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
পেশায় ঠিকাদার মোতাব শেখের এটিই প্রথম বিধানসভা নির্বাচন। এর আগে তিনি পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
ফারাক্কা আসনটি তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে থাকলেও এবার তারা তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিজেপি।
২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে বর্তমান নথিপত্রে নামের বানানে অমিল থাকার অজুহাতে বাদ পড়েছিলেন মোতাব। পাসপোর্ট ও অন্যান্য বৈধ নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও ট্রাইব্যুনাল তার নাম বাদ দিয়েছিল। পরে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে আধার কার্ডকে পরিচয়ের প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার নির্দেশ দেওয়া হলে পুনরায় ভোটার তালিকায় স্থান পান মোতাব।
নিজের ভাগ্যের এমন নাটকীয় পরিবর্তনে অবাক মোতাব দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘আমি বিশ্বের অন্যতম ভাগ্যবান মানুষ। এসআইআর-এর পর ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ায় আমি সব আশা হারিয়ে ফেলেছিলাম। ভেবেছিলাম, কোনোদিন ভোটই দিতে পারব না। কিন্তু মানুষ আমাকে ভোট দিয়ে জিতিয়েছে। এটি আসলে জনগণের জয়।’
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ২৭ লাখ নাম বাদ পড়েছিল, যার মধ্যে শুধু ফারাক্কাতেই ছিল ৩৮ হাজার ২২২ জন। মুর্শিদাবাদেই সর্বোচ্চ ১১ লাখের বেশি নাম বাদ যায়।
কাকতালীয়ভাবে নির্বাচনে কংগ্রেসের অপর জয়ী প্রার্থী জুলফিকার আলীও মুর্শিদাবাদের রানীনগর আসন থেকে জয়ী হয়েছেন। তিনি তৃণমূলের বর্তমান বিধায়ক আব্দুল সৌমিক হোসেনকে ২ হাজার ৭০১ ভোটে পরাজিত করেন।
মোতাব জানান, নির্বাচনে আদৌ লড়তে পারবেন কি না, এ অনিশ্চয়তা কাটার পর প্রচারের জন্য মাত্র ১৪ দিন সময় পেয়েছিলেন তিনি।
মোতাব বলেন, ‘প্রথমে কংগ্রেস আমাকে মনোনয়ন দিতে বেশ সময় নেয়। তারপর দেখলাম ভোটার তালিকা থেকে আমার নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে আমার নির্বাচনী এলাকার মাত্র অর্ধেক অংশে আমি প্রচার চালাতে পেরেছি। আরও সময় পেলে জয়ের ব্যবধান আরও বাড়ত।’
কংগ্রেসের মুখপাত্র সৌম্য আইচ রায় বলেন, ‘মোতাবের জয় প্রমাণ করে নির্বাচন কমিশন বিরোধী দলগুলোর জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কমিশন তার মনোনয়নপত্র নিতে বাধ্য হয়েছিল। তার জয় কংগ্রেসের প্রতি মানুষের আস্থার প্রতিফলন।’
তৃণমূলের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ এবং দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে মোতাব জানান, ফারাক্কা একসময় কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি ছিল। মানুষ এবার তৃণমূলকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
রাজ্যে ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে বিজেপি সরকার, এতে এলাকায় কাজ করতে সমস্যা হবে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে কংগ্রেসের এই নেতা বলেন, ‘আমি অহেতুক সংঘাতে বিশ্বাস করি না। বিজেপি ক্ষমতায় এলেও আমি আমার এলাকার উন্নয়নের জন্য নতুন সরকারের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করব।’
মোতাব শেখের প্রধান লক্ষ্য এলাকার পানীয় জলের সংকট নিরসন করা এবং যে ২৭ লাখ মানুষের ভবিষ্যৎ এসআইআর তালিকার কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তাদের দাবি বিধানসভায় তুলে ধরা।