পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী চন্দ্রনাথ রথ হত্যাকাণ্ড এখন রাজ্যের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ও অপরাধ তদন্তে পরিণত হয়েছে। একের পর এক গ্রেপ্তার, ভিনরাজ্যে অভিযান, পেশাদার শুটারের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত এবং রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সব মিলিয়ে ঘটনাটি শুধু একটি খুন নয়, বরং ক্ষমতার পালাবদলের পর বাংলার অস্থির রাজনৈতিক আবহের একটি প্রতীক হয়ে উঠছে।
গত ৬ মে রাতে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে গুলিতে নিহত হন চন্দ্রনাথ রথ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করছিলেন ও বিজেপির অভ্যন্তরে প্রভাবশালী সংগঠক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং মিলিটারি-স্টাইলে হামলা। মাত্র ৫০ সেকেন্ডের মধ্যে পুরো অপারেশন শেষ করা হয়।
প্রথম দিকে তদন্তে খুব বেশি অগ্রগতি না থাকলেও, এখন তদন্তের ফোকাস স্পষ্টভাবে চলে গেছে একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের দিকে। স্থানীয় পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্তকারী দল মনে করছে অন্তত এক থেকে দেড় মাস ধরে এই হত্যার পরিকল্পনা চলছিল। গ্রেপ্তার হওয়া তিন সন্দেহভাজনের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে তদন্তকারীরা এখন মাথা বা মূল পরিকল্পনাকারীর খোঁজে পৌঁছাতে চাইছেন।
এই মামলায় এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন বিহারের বক্সার থেকে এবং একজন উত্তরপ্রদেশের বালিয়া থেকে ধরা পড়েছেন। তদন্তকারীদের দাবি, ধৃতদের মধ্যে অন্তত একজন পেশাদার শুটার। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সিট, সিআইডি এবং এসটিএফ যৌথভাবে তদন্ত করছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, হামলায় অংশ নিয়েছিল অন্তত সাত থেকে আটজন। এর মধ্যে দুজন ছিলেন শার্পশুটার, আরেকজন টিপার বা তথ্যদাতা, যিনি চন্দ্রনাথ রথের গতিবিধি নজরদারি করছিলেন। পুলিশ ধারণা করছে, হামলাকারীরা বাইক ও একটি চারচাকা গাড়ি ব্যবহার করে আগে থেকেই রুট ব্লক করে রেখেছিল। চন্দ্রনাথের গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গেই খুব কাছ থেকে গুলি চালানো হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত গাড়িটি সম্ভবত ঝাড়খণ্ড থেকে আনা হয়েছিল। বালি টোলপ্লাজায় অনলাইনে টোল পেমেন্টের সূত্র ধরেই তদন্তকারীরা অভিযুক্তদের গতিবিধি শনাক্ত করতে সক্ষম হন। একইসঙ্গে একটি বাজেয়াপ্ত মোটরবাইকের চ্যাসিস নম্বর মুছে ফেলার তথ্যও সামনে এসেছে, যা পরিকল্পিত অপরাধের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চন্দ্রনাথ রথের পরিবারের পক্ষ থেকেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি করা হয়েছে। তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় কৌশিক দাস জানিয়েছেন, নির্বাচনের পর থেকেই চন্দ্রনাথ হুমকি পাচ্ছিলেন। হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুকে পাঠানো কিছু হুমকির বিষয়ে তিনি নিরাপত্তা সংস্থাকেও জানিয়েছিলেন বলে পরিবারের দাবি।
এই হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক প্রভাবও কম নয়। কারণ ঘটনাটি ঘটেছে বিজেপির সরকার গঠনের ঠিক আগমুহূর্তে। যেমন, ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন সরকার শপথ নেওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে এই খুন হওয়ায় ঘটনাটি আরও বেশি সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
বিজেপি ইতোমধ্যে ঘটনাটিকে রাজনৈতিক হত্যা হিসেবে বর্ণনা করেছে। দলের একাধিক নেতা প্রকাশ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। যদিও তৃণমূল এই অভিযোগ অস্বীকার করে উল্টো নিরপেক্ষ তদন্ত ও আদালতের পর্যবেক্ষণে সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই হত্যাকাণ্ড পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। প্রথমত, ক্ষমতার পরিবর্তনের সময় রাজনৈতিক সহিংসতার পুরনো সংস্কৃতি কি আবারও নতুন আকারে ফিরে আসছে? দ্বিতীয়ত, ভিনরাজ্যের পেশাদার শুটার ব্যবহারের অভিযোগ সত্য হলে তা বাংলার অপরাধ জগতের চরিত্র বদলের ইঙ্গিত দেয় কি না। আর তৃতীয়ত, রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রের এত কাছের একজন ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে হত্যা করার সাহস কারা পেল?
রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় হলো, এই হত্যার পেছনে কি শুধুই রাজনৈতিক প্রতিশোধ, নাকি এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও বড় কোনো অর্থনৈতিক বা সংগঠনগত দ্বন্দ্ব? কারণ চন্দ্রনাথ রথ শুধু একজন ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন না, তিনি শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ সাংগঠনিক বলয়ের অংশ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
এদিকে তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে এটি কোনো আকস্মিক হামলা ছিল না। বরং দীর্ঘ পরিকল্পনা, একাধিক রাজ্যের যোগাযোগ, পেশাদার অস্ত্রধারী এবং প্রযুক্তিগত নজরদারির সমন্বয়ে এটি ছিল একটি সুসংগঠিত টার্গেট কিলিং।
এখন নজর তদন্তকারীদের পরের পদক্ষেপের দিকে। কারণ গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সেই অদৃশ্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, যাদের নির্দেশে এই হত্যার ছক কষা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর সেই মাস্টারমাইন্ড ধরা পড়লে হয়তো পরিষ্কার হবে, এটি কি শুধুই একটি হত্যাকাণ্ড, নাকি পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনৈতিক যুগের প্রথম বড় বার্তা।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া ও আনন্দবাজার পত্রিকা