ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলার সিনেট ভবনে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশটির রাজনীতিকে নতুন করে অস্থির করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত সিনেটর রোনাল্ড দেলারোসাকে আটকের উদ্দেশ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ঘিরে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা, আতঙ্ক এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। সিনেট ভবনের ভেতর একের পর এক গুলির শব্দ শোনা যায়। আতঙ্কে সাংবাদিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দর্শনার্থীদের অনেকে আশ্রয় নেন নিরাপদ স্থানে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সশস্ত্র পুলিশ ও মেরিন সদস্যরা সুরক্ষা সরঞ্জাম পরে ভবনের ভেতরে ঢোকার কিছু সময় পরই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে শুরু করে।
ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নানা ভিডিও ও ছবি। কোথাও দেখা যায় সিনেট ভবনের করিডোরে দৌড়াদৌড়ি, কোথাও আবার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের অবস্থান নিতে। তবে কে গুলি চালিয়েছে বা আদৌ গুলি সরাসরি সংঘর্ষে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো পরিষ্কার বক্তব্য দেয়নি কর্তৃপক্ষ। তবু ঘটনাটি ফিলিপাইনের রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি করেছে।
এই ঘটনার কেন্দ্রে থাকা রোনাল্ড দেলারোসা ফিলিপাইনের রাজনৈতিক অঙ্গনের অত্যন্ত বিতর্কিত এবং প্রভাবশালী একটি নাম। তিনি শুধু একজন সিনেটর নন, দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের একজন হিসেবেও পরিচিত। দুতার্তে যখন ২০১৬ সালে ক্ষমতায় আসেন, তখন ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামে যে কঠোর অভিযান শুরু হয়েছিল, তার প্রধান বাস্তবায়নকারী ছিলেন দেলারোসা। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর দুতার্তে তাকে ফিলিপাইন জাতীয় পুলিশের প্রধান নিয়োগ দেন। এর আগে দক্ষিণাঞ্চলের দাভাও শহরে দুতার্তের পুলিশপ্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।
দেলারোসা দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দেশজুড়ে শুরু হয় ‘প্রজেক্ট ডাবল ব্যারেল’ নামে পরিচিত মাদকবিরোধী অভিযান। সরকার দাবি করেছিল, দেশকে মাদকমুক্ত করতে এই অভিযান প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভয়াবহ অভিযোগ তুলতে শুরু করে। তাদের ভাষ্য, এই অভিযানের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। বহু মানুষকে আদালতে তোলার আগেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দুতার্তে ক্ষমতায় আসার প্রথম ছয় মাসেই দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, প্রকৃত সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হতে পারে।
বিশেষ করে দরিদ্র শ্রেণির মানুষ, বস্তিবাসী এবং নিম্ন আয়ের তরুণদের বড় অংশ এই অভিযানের শিকার হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই নিহতদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগ বা বিচারিক প্রক্রিয়া ছিল না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিপাইনের সেই সময়কার পরিস্থিতি কার্যত রাষ্ট্রীয় সহিংসতার রূপ নিয়েছিল।
এই অভিযোগের ভিত্তিতেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) দীর্ঘ তদন্ত শুরু করে। পরে রোনাল্ড দেলারোসার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি পুলিশপ্রধান হিসেবে এমন একটি অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন, যেখানে পরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষ হত্যা, ভয়ভীতি সৃষ্টি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে।
তবে দেলারোসা শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তার দাবি, তিনি দেশের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য দায়িত্ব পালন করেছেন। মঙ্গলবার ফেসবুকে প্রকাশ করা এক ভিডিও বার্তায় তিনি সমর্থকদের সিনেট ভবনের সামনে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি দেশের জন্য কাজ করেছি। নিজের জন্য সম্পদ বানাইনি। আরেকজন ফিলিপিনোকে যেন হেগে পাঠানো না হয়।’
বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। দেলারোসার ভাষায়, তাকে আন্তর্জাতিক আদালতের হাতে তুলে দেওয়া হলে সেটি হবে দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য অপমানজনক। তবে মার্কোস প্রশাসন এখনো এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেয়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ইস্যু এখন ফিলিপাইনের ক্ষমতার রাজনীতিতে বড় এক পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। কারণ, দুতার্তে পরিবার এখনো দেশটির রাজনীতিতে বড় প্রভাব ধরে রেখেছে। অন্যদিকে মার্কোস প্রশাসন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মানবাধিকার প্রশ্নে ভিন্ন অবস্থান দেখানোর চেষ্টাও করছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তেও একই ধরনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তের মুখোমুখি। বর্তমানে ৮১ বছর বয়সী দুতার্তে আগেও বহুবার বলেছেন, মাদকবিরোধী অভিযানে তার কঠোর ভাষা ছিল অপরাধীদের ভয় দেখানোর কৌশল। তার আইনজীবীরাও দাবি করছেন, অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, গণহত্যা নয়। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, হাজার হাজার মৃত্যুর দায় শুধু বক্তব্য দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
ফিলিপাইনের সাম্প্রতিক এই ঘটনা দেশটির রাজনীতির গভীর বিভাজনকেও সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে দুতার্তে সমর্থকরা এখনো দেলারোসাকে ‘কঠোর কিন্তু দেশপ্রেমিক’ কর্মকর্তা হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, সিনেট ভবনের এই উত্তেজনা শুধু একজন সিনেটরকে ঘিরে নয়। এটি আসলে গত এক দশকের ফিলিপাইন রাজনীতির প্রতিচ্ছবি, যেখানে অপরাধ দমন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে। এখন পুরো বিশ্বের নজর— ফিলিপাইন সরকার শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আদালতের সঙ্গে কতটা সহযোগিতা করে এবং দেলারোসার ভবিষ্যৎ কোন দিকে গড়ায়।
সূত্র: রয়টার্স, এএফপি