গত ডিসেম্বরে ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে ভারতের হরিয়ানার গুরুগ্রাম শহরের মেদান্ত হাসপাতালের ক্যানসার ক্লিনিকে আসেন ৫৭ বছর বয়সী ধূমপায়ী জয় সিং (ছদ্মনাম)।
ততদিনে ক্যানসার তার মস্তিষ্ক, লিভার এবং হাড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি রেডিওথেরাপি (এক্স-রে, গামা রশ্মি বা প্রোটন ব্যবহার করে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করার পদ্ধতি) শুরু করলেও কেমোথেরাপি (শক্তিশালী ওষুধের মাধ্যমে ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা) নিতে ভয় পাচ্ছিলেন।
এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকেরা তাকে ইমিউনোথেরাপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যা ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে।
মেদান্ত হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান ডা. সজ্জন রাজপুরোহিত দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘জয় সিং অন্য রোগীদের কাছ থেকে কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে শুনেছিলেন। সৌভাগ্যবশত, পরীক্ষায় তার পিডি-এল১ প্রোটিনের মাত্রা ৭৫ শতাংশ পাওয়া যায়।’
এর অর্থ, ওই রোগীর শরীরে এই প্রোটিনের আধিক্য রয়েছে। সাধারণত ক্যানসার কোষগুলো এই প্রোটিনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থেকে নিজেদের লুকিয়ে রাখে। এই উচ্চ হারের মানে হলো তিনি ইমিউনোথেরাপির জন্য একদম উপযুক্ত।
ডা. রাজপুরোহিত বলেন, ‘সাধারণত ইমিউনোথেরাপি শরীরে প্রবেশ করাতে অনেক সময় লাগে। আমরা তাকে সদ্য বাজারে আসা ত্বকের নিচে প্রয়োগযোগ্য অ্যাটেজোলিজুমাব ইনজেকশন দেওয়ার পরামর্শ দিই।’
ওষুধ শিল্প জায়ান্ট রোশ সম্প্রতি ভারতীয় বাজারে তাদের ক্যানসার ইমিউনোথেরাপি ড্রাগ অ্যাটেজোলিজুমাব-এর এই ইনজেকশন সংস্করণটি নিয়ে এসেছে, যার ব্র্যান্ড নাম ‘টেসেন্ট্রিক’।
ডা. রাজপুরোহিত জানান, ইনজেকশনের মাধ্যমে ইমিউনোথেরাপি দেওয়া অনেক সহজ। এতে রোগীকে হাসপাতালে অনেক কম সময় কাটাতে হয় এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও অনেক কম। ফলে রোগীরা এখন এই চিকিৎসা গ্রহণে অনেক বেশি আগ্রহী হচ্ছেন।
কারা এই ইমিউনোথেরাপি ইনজেকশন নিতে পারবেন
এই চিকিৎসা মূলত ‘নন-স্মল সেল লাং ক্যানসার’ আক্রান্ত রোগীদের জন্য। ভারতে প্রতি বছর যে ৮১ হাজারের বেশি ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্ত হয়, তার একটি বড় অংশই এই ধরনের ক্যানসার।
তবে এই ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত সব রোগীই এই থেরাপি নিতে পারবেন না। এটি এমন এক ইমিউনোথেরাপি ওষুধ, যা বিশেষভাবে পিডি-এল১ রিসেপ্টরকে লক্ষ্য করে কাজ করে।
তাই যাদের অধিকাংশ ক্যানসার কোষে এই রিসেপ্টর রয়েছে, কেবল তারাই এই চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত। ‘নন-স্মল সেল লাং ক্যানসার’ আক্রান্ত রোগীদের প্রায় অর্ধেক এই চিকিৎসার আওতাভুক্ত হতে পারেন।
এটি রোগীদের কীভাবে সাহায্য করে
শিরার মাধ্যমে বা ত্বকের নিচে উভয় পদ্ধতিতে এই ওষুধ ফুসফুসের ক্যানসার রোগীদের সার্বিক আয়ু বাড়াতে এবং রোগটির ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। এটি মৃত্যুর ঝুঁকিও কমিয়ে আনে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ইনজেকশন সংস্করণটি হাসপাতালের বহির্বিভাগেই প্রশিক্ষিত নার্সদের মাধ্যমে মাত্র সাত মিনিটে উরুর ত্বকের নিচে প্রয়োগ করা সম্ভব। এতদিন এই ওষুধটি শিরার মাধ্যমে অনেক সময় নিয়ে শরীরে প্রবেশ করানো হতো।
এটি হাসপাতালের জন্যও সুবিধাজনক। কারণ, একজন রোগীকে শিরার মাধ্যমে ওষুধ দেওয়ার জন্য যে সময় লাগে, সেই একই সময়ে অন্তত পাঁচজন রোগীকে এই নতুন ইনজেকশন দেওয়া সম্ভব।
ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থার মতে, বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি পাঁচজন রোগীর মধ্যে চারজনই পুরনো পদ্ধতির চেয়ে এই নতুন ইনজেকশন পদ্ধতিটিকে বেশি পছন্দ করেছেন।
ওষুধের খরচ কত
চিকিৎসাটির খরচ এখনো অনেক বেশি; প্রতি ডোজের দাম ৩ লাখ ৭০ হাজার রুপি এবং অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে প্রায় ছয়টি ডোজের প্রয়োজন হয়। এ কারণে ওষুধের দাম কমিয়ে সাধারণ রোগীদের কাছে এর সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে ব্লু ট্রি নামে একটি সহায়তা কর্মসূচি চালাচ্ছে রোশ।
এছাড়া এই ওষুধটিকে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্য প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ডা. রাজপুরোহিত দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘ইনজেকশন সংস্করণের ক্ষেত্রে ওষুধের জৈব-সমতুল্য ডোজের পরিমাণ বেশি লাগে। শিরার মাধ্যমে নেওয়া ডোজ যেখানে ১ হাজার ২০০ মিলিগ্রাম, সেখানে ইনজেকশনের ক্ষেত্রে লাগে ১ হাজার ৮০০ মিলিগ্রাম। ফলে এই দুই পদ্ধতির খরচে প্রায় ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার রুপির মতো পার্থক্য হয়।’
‘তবুও সব মিলিয়ে খরচ প্রায় একই পড়ে, কারণ ইনজেকশন পদ্ধতিতে রোগীরা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খরচ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় এড়িয়ে চলতে পারেন,’ যোগ করেন এই চিকিৎসক।