মার্কিন হামলা, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং কয়েক মাসের ভয়াবহ সংঘাতের পরও ইরান আশঙ্কার চেয়ে অনেক দ্রুত নিজেদের খোয়া যাওয়া সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করছে, এমনটাই দাবি করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান বিশেষ করে ড্রোন উৎপাদন, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাপনা এবং সামরিক শিল্প অবকাঠামো পুনরায় সচল করার কাজে দ্রুত অগ্রগতি দেখাচ্ছে। এই পরিস্থিতি ওয়াশিংটনের জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সিএনএন–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিলের শুরুতে শুরু হওয়া ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সময়টাকে ইরান কৌশলগতভাবে কাজে লাগিয়েছে। মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বেশ কয়েকটি সামরিক স্থাপনা আংশিকভাবে আবার সচল করা হয়েছে। বিশেষ করে ড্রোন উৎপাদনের কিছু ইউনিট দ্রুত পুনরায় চালু করতে পেরেছে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র আগে ধারণা করেছিল, ইরানের সামরিক শিল্প ঘুরে দাঁড়াতে আরও অনেক বেশি সময় লাগবে। কিন্তু নতুন গোয়েন্দা মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, বাস্তবতা ভিন্ন।
এই প্রতিবেদন এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি শান্তিচুক্তিতে রাজি না হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আরও বড় হামলা চালাতে প্রস্তুত। তবে একই সঙ্গে তিনি এটাও জানিয়েছেন যে, আলোচনার সুযোগ দিতে আপাতত কিছুটা সময় অপেক্ষা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ইরানও পাল্টা কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ডস জানিয়েছে, নতুন করে হামলা হলে তার জবাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, তারা অপ্রত্যাশিত নতুন কৌশল ব্যবহার করতে প্রস্তুত। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পর ইরান নিজেদের সামরিক দুর্বলতা বুঝতে পেরেছে এবং এখন সেই ঘাটতি পূরণে জোর দিচ্ছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার সম্প্রতি কংগ্রেসে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের নৌবাহিনী ও সামরিক শিল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তার দাবি, ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। তবে একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, ইরান তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ভূগর্ভে সরিয়ে নিচ্ছে এবং সেগুলো ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও শক্তিশালী অস্ত্র প্রয়োজন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান এখন দুই দিক থেকে চাপের মধ্যে আছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক চাপ, অন্যদিকে দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা। চলতি বছরের শুরুতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ বড় আকার ধারণ করে। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। এমনকি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তার ছেলে মুজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করা হয় বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
তবে এত চাপের মধ্যেও ইরান যে দ্রুত নিজেদের পুনর্গঠন করতে পারছে, সেটাই এখন ওয়াশিংটনের সবচেয়ে বড় চিন্তার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দেশটি এখনো ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক সামরিক নেটওয়ার্ক ধরে রাখতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ভবিষ্যৎ সংঘাতের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে ইরান কত দ্রুত তাদের সামরিক শক্তি পুরোপুরি পুনর্গঠন করতে পারে তার ওপর।
সূত্র: সিএনএন, রয়টার্স, দ্য নিউইয়র্ক পোস্ট, দ্য বিজনেস ইনসাইডার