যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা প্রধানের পদ থেকে হঠাৎ সরে দাঁড়িয়েছেন তুলসি গ্যাবার্ড। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি জানিয়েছেন, তার স্বামী বিরল ধরনের হাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ায় পরিবারের পাশে দাঁড়াতেই তিনি দায়িত্ব ছাড়ছেন। কিন্তু ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অন্দরমহলে এখন আলোচনা অন্য জায়গায়। অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন, এটি শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের গভীর মতবিরোধ, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ নিয়ে সংঘাতের ফল।
তুলসি গ্যাবার্ড দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত। তিনি ইরাক যুদ্ধ, সিরিয়া অভিযান এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নানা সামরিক তৎপরতার কড়া সমালোচক ছিলেন। এমনকি ডেমোক্র্যাট দল ছেড়ে রিপাবলিকান শিবিরে গেলেও তার ‘যুদ্ধবিরোধী’ অবস্থান পুরোপুরি বদলায়নি। আর সেখানেই ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধমুখী অংশের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হতে থাকে।
বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে সেই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। কয়েক মাস আগে কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তুলসি বলেছিলেন, ইরান এখনো সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোয়নি। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার ঘনিষ্ঠ মহল তখন দাবি করছিল, ইরান খুব দ্রুত পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের দিকে এগোচ্ছে এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি। এই দুই অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট ফাটল দেখা যায়। পরে তুলসি নিজের বক্তব্য কিছুটা নরম করলেও ট্রাম্পপন্থী অনেকেই মনে করেন, তিনি যথেষ্ট সিরিয়াস ছিলেন না।
ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তুলসি ধীরে ধীরে প্রশাসনের কেন্দ্র থেকে সরে যাচ্ছিলেন। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা মহলের অনেকেই তাকে পুরোপুরি বিশ্বাসও করতেন না। কারণ অতীতে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ, রাশিয়া ও ইউক্রেন ইস্যুতে তার কিছু বক্তব্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতির সমালোচনা নিয়ে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট, দুই শিবির থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল। অতীতে তিনি ডেমোক্র্যাট ছিলেন, তার নীতি ও আদর্শ ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে এখনো দারুণভাবে মিলে যায়। যুদ্ধবাজ ট্রাম্পের সঙ্গে তার বনিবনা হচ্ছিল না। যদিও তিনি প্রকাশ্য কোনো মন্তব্য করেননি।
আরও বড় ধাক্কা আসে মার্চে, যখন তুলসির ঘনিষ্ঠ সহযোগী জো কেন্ট পদত্যাগ করেন। কেন্ট প্রকাশ্যে অভিযোগ করেছিলেন, ইরান যুদ্ধ নিয়ে হোয়াইট হাউসে অতিরিক্ত চাপ ও ইসরায়েলপন্থী লবির প্রভাব বাড়ছে। সেই ঘটনার পর থেকেই গুঞ্জন শুরু হয়, তুলসিও বেশিদিন থাকছেন না।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, তুলসির পদত্যাগ আসলে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের আদর্শগত সংঘাতকে সামনে নিয়ে এসেছে। ট্রাম্পের দলে এখন দুই ধরনের ধারা স্পষ্ট। একদল চায় মধ্যপ্রাচ্যে আরও শক্ত অবস্থান ও সামরিক অভিযান, অন্যদল মনে করে দীর্ঘ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে ক্লান্ত ও দুর্বল করে ফেলছে। তুলসি ছিলেন দ্বিতীয় ধারার অন্যতম পরিচিত মুখ। কিন্তু ইরান হামলার পর প্রশাসনের ভেতরে যুদ্ধপন্থীদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
তুলসির পদত্যাগ আরও একটি বার্তা দিচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরেও এখন গভীর বিভাজন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য নীতি, ইরান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক সামরিক কৌশল নিয়ে ঐক্য নেই। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, তুলসির বিদায় ট্রাম্প প্রশাসনকে আরও আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। কারণ তার জায়গায় যিনি ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব নিচ্ছেন, তিনি ট্রাম্পের নিরাপত্তা অবস্থানের আরও ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।
তবে তুলসির সমর্থকেরা বলছেন, তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে পুরোপুরি সরে আসেননি। যুদ্ধবিরোধী ভাবমূর্তি নিয়েই তিনি আমেরিকান রাজনীতিতে পরিচিতি পেয়েছিলেন, আর সেই অবস্থানই শেষ পর্যন্ত তাকে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতে নিয়ে গেছে। ফলে তিনি তার অবস্থানেই আছেন, বরং ট্রাম্প প্রশাসনই তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি।
ওয়াশিংটনে এখন বড় প্রশ্ন, তুলসি গ্যাবার্ড কি সত্যিই শুধু পারিবারিক কারণে সরে গেলেন, নাকি ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের ভেতরের ক্ষমতার লড়াইয়ের বলি হলেন? আপাতত সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর কেউ দিচ্ছে না। তবে তার পদত্যাগ যে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোর অস্থিরতার নতুন ইঙ্গিত, তা নিয়ে খুব কম মানুষেরই দ্বিমত আছে।
সূত্র: রয়টার্স, সিএনএন