ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সামরিক অভিযান চালিয়েও দেশটিকে পুরোপুরি দুর্বল করা যায়নি, বরং যুদ্ধের মধ্যেই তেহরান আরও বিপজ্জনকভাবে নিজেদের অবস্থান গুছিয়ে নিয়েছে। এমন মন্তব্য উঠে এসেছে ইসরায়েলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম জেরুজালেম পোস্টের এক বিশ্লেষণে। সেখানে বলা হয়েছে, যুদ্ধ ইরানকে ধ্বংস করেনি; বরং দেশটি নিজেদের সামরিক কাঠামো, আঞ্চলিক জোট এবং কৌশলগত অবস্থান আরও শক্ত করেছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল শুরুতে ধারণা করেছিল, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে টার্গেট করে হামলা চালালে দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে সেটি হয়নি। বরং সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি নিহত হওয়ার পরও ইরানের রাষ্ট্রযন্ত্র দ্রুত বিকল্প নেতৃত্ব সক্রিয় করে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অধীনে সামরিক কমান্ড আবার সংগঠিত হয়।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান বহু বছর ধরেই এমন পরিস্থিতির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেছিল। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বদলে বিভিন্ন প্রাদেশিক ইউনিটে ভাগ করা হয়, যাতে শীর্ষ নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরো কাঠামো সচল থাকে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কৌশলগত হিসাবই ভুল প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
শুধু সামরিক দিক নয়, তথ্যযুদ্ধেও ইরানকে এখন বড় প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির ভেতরে ইন্টারনেট দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলেও আন্তর্জাতিক পরিসরে ইরানের প্রচারণা থেমে নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সাক্ষাৎকার এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারণার মাধ্যমে তেহরান নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের পাশাপাশি এখন নেরেটিভ তৈরির লড়াইও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে ইরান এখন আরও শক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। তেহরান ইতোমধ্যে নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে তারা সমুদ্রপথে চলাচল ও সমুদ্রতলের যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ দাবি করছে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের আরেক বড় প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জোটে। ইরান এখন আগের চেয়ে আরও বেশি চীন, রাশিয়া এবং পাকিস্তানের কাছাকাছি চলে গেছে। রাশিয়া সামরিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে, চীন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করছে, আর পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় উঠে এসেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসছে।
এদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। গাজা যুদ্ধ, লেবানন সীমান্ত এবং ইরান সংঘাতের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে। ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থায় বড় বিনিয়োগ বাড়িয়েছে ইসরায়েলি কোম্পানিগুলো। জেরুজালেম পোস্টের একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই বছরে দেশটির প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাত প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
তবে সমালোচকেরা বলছেন, সামরিক শক্তি দিয়ে শুধু অবকাঠামো ধ্বংস করা যায়, কিন্তু একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো ভাঙা অনেক কঠিন। ইরান এখনো পুরোপুরি পরাজিত হয়নি, এই বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য নতুন কৌশলগত সংকট তৈরি করছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, এই সংঘাতের পেছনে শুধু পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থও কাজ করছে। ইরানে বিপুল পরিমাণ লিথিয়াম ও বিরল খনিজ সম্পদের মজুত রয়েছে, যা আগামী প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইরানকে ঘিরে লড়াই শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়; এটি ভবিষ্যতের বৈশ্বিক শক্তির লড়াইয়েও পরিণত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ আপাতত থেমে থাকলেও মূল সংঘাত শেষ হয়নি। বরং এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইরান কি শেষ পর্যন্ত আরও শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হবে, নাকি নতুন কোনো বড় সামরিক অভিযান আবার অঞ্চলটিকে আগুনের মুখে ঠেলে দেবে?
সূত্র: জেরুজালেম পোস্ট, রয়টার্স, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণ প্রতিবেদন