মাসের পর মাস ধরে চলা উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হামলা আর যুদ্ধের শঙ্কার পর অবশেষে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, দুই দেশের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতার বেশিরভাগ বিষয় নিয়ে আলোচনা শেষ হয়েছে। তবে এখনো কিছু বিষয়ে মতবিরোধ রয়ে গেছে। যে কারণে ট্রাম্প চূড়ান্ত চুক্তির জন্য সময় নিচ্ছেন।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি নিয়ে টানাপোড়েন এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এই পথ দিয়েই বিশ্বের বড় অংশের জ্বালানি তেল পরিবহন হয়। যুদ্ধ শুরুর পর সেখানে জাহাজ চলাচল প্রায় অচল হয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে বিশ্ববাজারে। তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়, ইউরোপ ও এশিয়ার বহু দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। এখন সম্ভাব্য সমঝোতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত কমতে শুরু করেছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দেশ একটি সমঝোতা স্মারক তৈরির দিকে এগোচ্ছে। এই নথিতে যুদ্ধ থামানো, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরুর রূপরেখা থাকতে পারে। তবে এখনো সবচেয়ে বড় জট রয়ে গেছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যুতে। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান তাদের উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তর করুক। অন্যদিকে তেহরান বলছে, নিজেদের পারমাণবিক অধিকার তারা ছাড়বে না।
আলোচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, সম্ভাব্য সমঝোতার আওতায় প্রথমে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হতে পারে। এই সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণ করবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে তাদের নৌ অবরোধ তুলে নেবে। একই সঙ্গে ইরানের বিদেশে আটকে থাকা কিছু অর্থ ছাড়ের বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
তবে এই আলোচনা মোটেও সহজ নয়। ইরানের ভেতরেই এখন বড় ধরনের মতবিরোধ চলছে। দেশটির কঠোরপন্থি গোষ্ঠীগুলো মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আপস করা মানে দুর্বলতা দেখানো। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সংকট ও জনগণের চাপের কারণে তুলনামূলক বাস্তববাদী অংশ আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বন্দ্বের কারণেই চূড়ান্ত চুক্তি হতে সময় লাগছে।
সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি নীতিগতভাবে কিছু ছাড় দিতে রাজি হয়েছেন বলে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সেটি স্বীকার করেনি। বরং তারা বলছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ইরানের হাতেই থাকবে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইরান তাদের সামরিক সক্ষমতা দ্রুত পুনর্গঠন করছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষ করে ড্রোন উৎপাদন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি পুনর্নির্মাণে তেহরান প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত এগোচ্ছে। এতে ওয়াশিংটনের ভেতরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ আলোচনার আড়ালে ইরান সময় নিচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সমঝোতা সফল হলে সেটি শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেই নয়, পুরো অঞ্চলের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন সংঘাতেও এর প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিও কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। কারণ হরমুজ প্রণালি সচল হওয়া মানে বিশ্ববাজারে আবার স্বাভাবিক জ্বালানি সরবরাহ ফিরতে শুরু করা। আর জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া মানে বিশ্ব অর্থনীতিরও হালে পানি পাওয়া।
তবে এখনো সবকিছু অনিশ্চিত। কারণ অতীতেও বহুবার আলোচনা শেষ মুহূর্তে ভেঙে পড়েছে। এবারও সেই আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে ইরানের কট্টরপন্থি সামরিক গোষ্ঠী এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এই সমঝোতার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বর্তমানে পুরো বিশ্বের নজর এখন তেহরান ও ওয়াশিংটনের দিকে। যুদ্ধের আগুন কি সত্যিই নিভবে, নাকি আবারও নতুন করে সংঘাত শুরু হবে মধ্যপ্রাচ্যে? এ প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই।
সূত্র: সিএনএন, রয়টার্স, আল জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান।