ইরান যুদ্ধ সূতার ওপর ঝুলছে। বল এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোর্টে। তিনি বৈঠকের পর বৈঠক করছেন যুদ্ধ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে। রীতিমত হয়রান তিনি যুদ্ধ সামলাতে গিয়ে। ইরানকে আমেরিকা ও তার মিত্র ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। তেহরানের কাছে পরমাণু অস্ত্র তৈরির ইউরেনিয়াম আছে, এ ধরনের নানা অভিযোগ তুলে তাকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে একেবারে গায়ে পড়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল ইসরায়েল ও আমেরিকা।
একে একে ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি ইসরায়েল ও আমেরিকা। দিনের পর দিন বোমা মেরে গেছে তেহরানের ওপর। কিন্তু তারা ধারনাও করতে পারেনি যে ইরানও পাল্টা জবাব দিতে পারবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে একের পর এক দূরপাল্লার ক্ষেপনাস্ত্র হামলা করে ইসরায়েলকে নাস্তানাবুদ করেছে ইরান।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বহু বছর ধরেই এই পরিচিত পশ্চিমা বয়ান প্রচলিত: ইরান মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে এবং দেশটি ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য সরাসরি বিপদ। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু বিশ্লেষণ, কূটনীতিক তথ্য ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলছে, এই হুমকির গল্পের কতটা বাস্তব, আর কতটা রাজনৈতিক প্রচারণা?
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরানকে ঘিরে ইসরায়েলের যে দীর্ঘদিনের আতঙ্কের বয়ান, তা মূলত আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য ধরে রাখার একটি রাজনৈতিক কৌশল ছিল। লেখাটির দাবি, ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় ভয় ইরানের সামরিক শক্তি নয়; বরং একটি শক্তিশালী ইরান মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের একক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
তবে বাস্তবতা আরও জটিল। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বারবার বলেছে, তারা এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না যে ইরানের পুরো কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। কারণ সাম্প্রতিক সংঘাতের পর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে গেছে। ফলে ইরানের মজুত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বর্তমান অবস্থা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে এমন পরিমাণ উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, যা আরও প্রক্রিয়াজাত করা হলে একাধিক পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। তবে এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পরমাণু অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা থাকা আর বাস্তবে অস্ত্র তৈরি করা এক বিষয় নয়। অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে ইরান পরমাণু অস্ত্র বানানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনাকে ঘিরে। কয়েক মাসের উত্তেজনা, সামরিক হামলা এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়ার পর এখন দুই দেশ আবারও আলোচনার টেবিলে বসেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র বলছে, ওয়াশিংটন এখন আগের মতো শাসন পরিবর্তন বা সম্পূর্ণ সামরিক সমাধানের কথা বলছে না। বরং মূল আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো।
বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, যদি ইরান সত্যিই তাৎক্ষণিকভাবে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতিতে থাকত, তাহলে বর্তমান কূটনৈতিক আলোচনা এত দূর এগোত না। অন্যদিকে ইসরায়েলপন্থী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের অতীত কার্যক্রম, গোপন স্থাপনা এবং পরিদর্শনে বাধা দেওয়ার ইতিহাসের কারণে সন্দেহ পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
এখানেই তৈরি হয়েছে দুই ধরনের বয়ান। এক পক্ষ বলছে, ইরানের প্রচ্ছন্ন এই হুমকিকে অতিরঞ্জিত করে বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা হয়েছে। অন্য পক্ষের দাবি, ইরানের প্রকৃত সক্ষমতাকে ছোট করে দেখাও বিপজ্জনক হতে পারে। ফলে সত্যটা হয়তো মাঝামাঝি কোথাও।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আরেকটি পুরোনো বিতর্কও আবার সামনে এসেছে। ইসরায়েলকে দীর্ঘদিন ধরেই অঞ্চলের একমাত্র পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে মনে করা হয়। যদিও দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো নিজের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। এই অবস্থায় অনেক সমালোচক প্রশ্ন তুলছেন, যদি একটি দেশের পরমাণু সক্ষমতা নিয়ে এত আন্তর্জাতিক চাপ থাকে, তাহলে অন্য দেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বচ্ছতা কেন নেই?
এদিকে ইরানের ভেতরেও অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সাম্প্রতিক সংঘাতের ক্ষত এখনো স্পষ্ট। দেশটির জনগণের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের জন্য সরাসরি যুদ্ধের চেয়ে কূটনীতিক সমঝোতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে যে গল্পটি কয়েক দশক ধরে বলা হয়েছে, সেটি এখন নতুন করে পর্যালোচনার মুখে। কেউ বলছেন এটি ছিল ভয়ভিত্তিক রাজনৈতিক বয়ান, কেউ বলছেন বাস্তব নিরাপত্তা উদ্বেগ। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার খেলায় ‘ইরান হুমকি’ প্রশ্নটি এখন আর আগের মতো কাজ করছে না। নতুন নতুন তথ্য, নতুন কূটনীতি এবং নতুন বাস্তবতা পুরোনো দাবিগুলোকে বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। একদা ইরাককেও বিশ্ব হুমকি হিসেবে তুলে ধরে ফায়দা হাসিলের মার্কিন কৌশলকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই, রয়টার্স, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য টাইমস, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস।