মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ প্রতিদিন এই সরু পথ দিয়েই যাতায়াত করে। আর সেই হরমুজ প্রণালির ওপর আরও আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছে ইরান। দেশটির পার্লামেন্টে এমন একটি পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা কার্যকর হলে প্রণালিটিতে জাহাজ চলাচল, নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন নিয়মকানুনের ওপর তেহরানের প্রভাব আরও বাড়বে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত পরিকল্পনাটি কমিশনে চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্টের ব্যবস্থায় পাঠানো হয়েছে। তার ভাষায়, ইরান এই ভৌগোলিক অবস্থানকে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি কমেনি। চলতি বছরের সংঘাতের সময় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। কিছু সময়ের জন্য প্রণালিটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি শুধু একটি সমুদ্রপথ নয়; এটি বিশ্বের জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শিরা। উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও তরল গ্যাসের বড় অংশ এই পথ দিয়েই এশিয়া, ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে যায়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক মহলের একটি অংশ এখন প্রকাশ্যেই বলছে, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা তাদের আইনি অধিকার। সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারাও দাবি করেছেন, এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের নিরাপত্তা ও প্রভাব আরও বাড়বে।
সম্প্রতি ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এমন খবরও এসেছে যে, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন নিয়ম, নির্দিষ্ট পথ এবং বিভিন্ন ধরনের সেবামূলক ফি নির্ধারণ করা হতে পারে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, চীন, জাপান, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের জাহাজ চলাচল নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ চলছে।
অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিতর্কিত হতে পারে। কারণ হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে পরিচিত। বিশ্বের বহু দেশ মনে করে, কোনো একক রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ভবিষ্যতে নতুন কূটনীতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
তবে ইরানের ভেতরেও এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। দেশটির কিছু রক্ষণশীল আইনপ্রণেতা মনে করেন, হরমুজ প্রণালিকে কেবল রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। তারা বলছেন, যদি কোনো সমঝোতার মাধ্যমে প্রণালি খুলে দেওয়া হয় কিন্তু বিনিময়ে ইরানের কৌশলগত স্বার্থ নিশ্চিত না হয়, তাহলে সেটি দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পরোক্ষ আলোচনায় হরমুজ প্রণালিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। একটি খসড়া সমঝোতার আলোচনায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা, সামরিক উত্তেজনা কমানো এবং প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে সমন্বয়ের বিষয় উঠে এসেছে। যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও নতুন কূটনীতিক সমীকরণের মধ্যে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের এই পদক্ষেপকে অনেকেই একটি বড় কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখছেন। কারণ তেহরান ভালোভাবেই জানে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের প্রশ্নে তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত শুধু উপসাগরীয় অঞ্চল নয়, বরং পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: তুর্কিয়ে টুডে, রয়টার্স, আনাদোলু এজেন্সি, ইরান ইন্টারন্যাশনাল, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, ওয়াশিংটন টাইমস, ডেইলি সাবাহ।