ইরানকে ঘিরে কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনা, হামলা-পাল্টা হামলা এবং কূটনীতিক টানাপোড়েনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ইরান যুদ্ধে জড়ানো ঠিক হয়নি এবং এখন পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে কি না। উত্তরে তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত সবকিছু নির্ভর করছে একটি ভালো চুক্তির ওপর। যদি এমন কোনো চুক্তি আসে, যা আমাদের জন্য ভালো নয়, তাহলে সেটাই হবে সীমারেখা। আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি, দেখছি কী হয়।
তার বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, আপাতত তিনি নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে যেতে চাইছেন না। বরং আলোচনার পথ খোলা রাখতে আগ্রহী।
ফক্স নিউজের আরেক আলোচনায় ট্রাম্প বলেন, শুরু থেকেই তিনি বিশ্বাস করতেন ইরান পরিস্থিতিকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে সংঘাত এড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে এখন তার ভাষায়, ‘ইরান যুদ্ধে যাওয়া ঠিক হয়নি। আমরা ভুল হিসাব করেছি।’ যদিও তিনি সরাসরি পুরো যুদ্ধকে ভুল বলেননি, কিন্তু তার বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া কারও জন্যই লাভজনক নয়।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইসরায়েল তাকে যুদ্ধে ঠেলে দেয়নি। বরং তার বিশ্বাস ছিল, ইরান আগে আঘাত হানতে পারে। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েল আমাকে বাধ্য করেনি। আমি মনে করেছি পরিস্থিতি এমন ছিল, যেখানে তারা আগে আঘাত করতে পারত।’ এমনকি তিনি মন্তব্য করেন, ‘হয়তো আমিই ইসরায়েলকে কঠোর অবস্থান নিতে উৎসাহিত করেছি।’
তবে একই সঙ্গে ট্রাম্প কঠোর অবস্থানও ধরে রেখেছেন। তিনি বলেছেন, যদি ইরানের সঙ্গে এমন কোনো সমঝোতা না হয় যা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষা করবে, তাহলে ভবিষ্যতে আবারও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। তার ভাষায়, ‘আমরা দেখব। প্রয়োজন হলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
প্রসঙ্গত, কয়েক মাস আগেও ট্রাম্প সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে কথা বলছিলেন। তখন তিনি দাবি করেছিলেন, তার সমর্থকেরা ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানকে সমর্থন করে এবং ইরানকে কখনোই পরমাণু অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। সেই সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমার সমর্থকেরা জানেন, আমরা আমাদের মাথার ওপর কোনো পরমাণু বোমার ভয় ঝুলতে দিতে পারি না।’
কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত বদলেছে। কয়েক মাসের সংঘাতের পরও ইরানের সরকার ভেঙে পড়েনি। দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার বড় অংশও টিকে আছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও যুদ্ধের অর্থনৈতিক খরচ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার মতো বিষয় রয়েছে। যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও দুই ধরনের অবস্থান দেখা যাচ্ছে। একদিকে আলোচনার পথ খোলা রাখা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিরক্ষাবিষয়ক কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে আবারও হামলা চালানোর প্রস্তুতি রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা এখনো সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি প্রস্তুত অবস্থায় রেখেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে একটি বড় পরিবর্তন স্পষ্ট। কয়েক মাস আগেও যেখানে ট্রাম্পের মুখে ‘পূর্ণ বিজয়’ ও ‘কঠোর জবাব’ এর মতো শব্দ ছিল মূল বার্তা, এখন সেখানে ‘চুক্তি’, ‘সমঝোতা’ এবং ‘যুদ্ধ এড়ানো’ শব্দগুলো বেশি শোনা যাচ্ছে। এর পেছনে অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং দীর্ঘ সংঘাতে জনগণের অনীহা সবকিছুরই প্রভাব রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তাই ফক্স নিউজে ট্রাম্পের ‘ইরান যুদ্ধে যাওয়া ঠিক হয়নি’ মন্তব্য শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং এটি হয়তো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আলোচনার টেবিলের দিকে সরে যাচ্ছে। তবে সেই পথ কতটা দীর্ঘ, আর শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা আদৌ হবে কি না সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সূত্র: ফক্স নিউজ, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য টাইমস, নিউ ইয়র্ক পোস্ট, জেরুজালেম পোস্ট, কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস।