কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ লেবাননের বিউফোর্ট দুর্গ দখল করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। এটিকে হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের অভিযানের একটি ‘নির্ধারক পরিবর্তন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এমন এক সময়ে ঘটনাটি ঘটল, যখন ইসরায়েলি সেনারা লিতানি নদীর মূল সীমারেখা পেরিয়ে লেবাননের ভূখণ্ডের আরো গভীরে অগ্রসর হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি ইসরায়েলের এই সর্বশেষ আগ্রাসনের সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) দক্ষিণ লেবাননের আরও বড় এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্য সতর্ক করেছে।
এ ঘটনায় লেবাননের প্রধানমন্ত্রী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘কালেক্টিভ পানিশমেন্ট বা যৌথ শাস্তি’ দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো লেবাননের বাসিন্দাদের জাহরানি নদীর নিচের পুরো দক্ষিণ লেবানন ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিল ইসরায়েল।
আইডিএফ-এর একজন মুখপাত্র বলেন, ‘হেজবুল্লাহর সদস্য, স্থাপনা অথবা যুদ্ধের সরঞ্জামের কাছাকাছি থাকা যে কোনো ব্যক্তি নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন।’
এই মুখপাত্র আরও বলেন, ‘উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আইডিএফের স্থলসেনা এই অভিযানে অংশ নিয়েছে। এটি বর্তমানে আরও নতুন নতুন এলাকায় সম্প্রসারিত হচ্ছে’
রোববার (৩১ মে) যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে যোগ দিয়ে ইসরায়েল ও হেজবুল্লাহকে এই ক্রমবর্ধমান সংঘাত বন্ধ করার আহ্বান জানান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ কুপার লিখেছেন, ‘লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা ও বাস্তুচ্যুত করেছে, অবকাঠামো ধ্বংস করেছে ও কূটনীতির সুযোগ সংকুচিত করেছে। এটি অবশ্যই বন্ধ হতে হবে। হেজবুল্লাহকেও অবশ্যই ইসরায়েলের ওপর হামলা বন্ধ করতে হবে এবং নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে।’
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দেশের দক্ষিণে ‘স্কর্চড-আর্থ পলিসি বা পোড়ামাটি নীতি এবং কালেকটিভ পানিশমেন্ট বা যৌথ শাস্তি’ দেওয়ার অভিযোগ এনেছেন।
অন্যদিকে লেবাননের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক থাকা ফ্রান্স ইসরায়েলি সামরিক অভিযান নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি জরুরি বৈঠক ডাকার অনুরোধ করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এক্স এ লিখেছেন, ‘এটা অত্যন্ত জরুরি যে, সবপক্ষের অস্ত্রগুলোই শান্ত হোক এবং তা চিরতরের জন্য। দক্ষিণ লেবাননে বর্তমানে যে বড় ধরনের আগ্রাসন চলছে, তার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
অন্যদিকে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল বলেন, ‘ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দক্ষিণ লেবাননের আরও ভেতরে অগ্রসর হওয়া গুরুতর উদ্বেগের কারণ। যে কোনো ধরনের আরও উত্তেজনা বৃদ্ধি এই পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলবে এবং লেবাননের ভেতরে নতুন করে বাস্তুচ্যুতির ঢেউ তৈরি করবে।’
লিতানি উপত্যকার ওপর অবস্থিত বিউফোর্ট দুর্গটি প্রায় ৯০০ বছর আগে নির্মাণ করেছিল ক্রুসেডাররা। এরপর থেকেই এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে এই দূর্গ। ৪৪ বছর আগে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এই দূর্গটি দখল করেছিল। ইসরায়েলে যুদ্ধটি প্রথম লেবানন যুদ্ধ নামে পরিচিত।
দূর্গটি দখলের পর রোববার এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, ‘এটি ছিল আমাদের নীতির একটি নিষ্পত্তিমূলক স্টেজ বা ধাপ এবং নিষ্পত্তিমূলক পরিবর্তন। আমরা ভয়ের দেয়াল ভেঙে ফেলেছি। আমরা উদ্যোগ নিচ্ছি, আমরা সব ফ্রন্ট যেমন: সিরিয়া, গাজা এবং লেবাননে অভিযান চালাচ্ছি।’
নেতানিয়াহু জানান, তার লক্ষ্য হলো হেজবুল্লাহর নিয়ন্ত্রণে থাকা জায়গাগুলোর ওপর দখল আরো জোরদার করা এবং প্রসারিত করা।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ৪৪ বছর আগে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) বিরুদ্ধে যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেন, সেটি ছিল লেবাননের যুদ্ধের প্রথম যুদ্ধগুলোর একটি। তিনি বলেন, ‘গোলানি ব্রিগেড, যারা তখন এটি দখল করেছিল, তারা আবার ফিরে এসেছে এবং এই দূর্গের ওপর ইসরায়েলি পতাকা উত্তোলন করেছে। তাই, ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি কৌশলগত বিজয়ের পাশাপাশি অত্যন্ত প্রতীকী একটি বিজয়।’
ইসরায়েল সীমান্ত থেকে মাত্র ১৪ দশমিক পাঁচ কিলোমিটার (নয় মাইল) দূরে অবস্থিত দূর্গটি ১৯৮২ সালে ইসরায়েল প্রথম দখল করে। তবে ২০০০ সালে তারা যখন দক্ষিণ লেবাননে তাদের স্বঘোষিত বাফার জোন (নিরাপদ অঞ্চল) ছেড়ে চলে যায়, তখন তারা এই দূর্গ ছেড়ে চলে যায়।
লেবাননের মানুষের জন্য এটি হলো সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দখল হওয়া সর্বশেষ ঐতিহাসিক নিদর্শন, অন্যদিকে আরও উত্তরে অবস্থিত নাবাতিহ শহরটি ক্রমশ আইডিএফ এর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।