কয়েক বছর আগেও তাদের নাম মূলত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দর্শকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন সেঙ্ক উইগুর ও হাসান পাইকারকে নিয়ে আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে ব্রিটেন, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদমাধ্যমেও। কারণ ব্রিটিশ সরকার সম্প্রতি এই দুই মার্কিন রাজনৈতিক ভাষ্যকারের দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি বাতিল করেছে। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার ঘটনা নয়; বরং এটি বাকস্বাধীনতা, গাজা যুদ্ধ, ইসরায়েল সমালোচনা ও পশ্চিমা গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের সীমা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সেঙ্ক উইগুর যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম পরিচিত প্রগতিশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার। তুরস্কে জন্ম নেওয়া এই মার্কিন নাগরিক দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অনলাইন সংবাদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত। তিনি জনপ্রিয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইয়াং টার্কস’-এর প্রতিষ্ঠাতা। ইউটিউবভিত্তিক এই প্ল্যাটফর্মটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বাধীন রাজনৈতিক সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতি মাসে তাদের অনুষ্ঠান কোটি কোটি বার দেখা হয়।
অন্যদিকে হাসান পাইকার সেঙ্ক হচ্ছেন উইগুরের ভাগ্নে। তিনি নতুন প্রজন্মের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক সম্প্রচারকদের একজন। লাইভ সম্প্রচারমাধ্যমে তার অনুসারীর সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন। যুক্তরাষ্ট্রের তরুণদের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে তিনি একটি পরিচিত মুখ। ডোনাল্ড ট্রাম্প, বৈষম্য, গাজা যুদ্ধ, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও করপোরেট ক্ষমতার সমালোচনার জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত।
দুজনের রাজনৈতিক অবস্থান বামপন্থী ও প্রগতিশীল হলেও তাদের জনপ্রিয়তার মূল কারণ হলো তারা প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের বাইরে থেকে সরাসরি দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ফলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তাদের প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
সম্প্রতি তারা লন্ডনের একটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও সংস্কৃতি সম্মেলন এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বিতর্কসভায় অংশ নিতে ব্রিটেনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু যাত্রার ঠিক আগে ব্রিটিশ সরকার তাদের ভ্রমণ অনুমতি বাতিল করে দেয়। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, এই দুই ব্যক্তির উপস্থিতি ‘জনস্বার্থের অনুকূল নাও হতে পারে’। তবে বিস্তারিত কোনো কারণ প্রকাশ করা হয়নি।
এরপরই বিতর্ক শুরু হয়। সেঙ্ক উইগুর সামাজিক মাধ্যমে দাবি করেন, তাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে শুধু ইসরায়েলের সমালোচনা করার কারণে। হাসান পাইকারও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তাদের বক্তব্য, গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সমালোচনা করায় পশ্চিমা সরকারগুলো ক্রমশ কঠোর অবস্থান নিচ্ছে।
তবে সমালোচকদের বক্তব্য ভিন্ন। ব্রিটেনের কিছু রাজনীতিবিদ ও ইহুদি সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে হাসান পাইকারের কিছু পুরোনো মন্তব্যের সমালোচনা করে আসছে। বিশেষ করে হামাস, ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা ও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে তার কিছু বক্তব্য বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল। বিরোধীরা দাবি করেন, এসব মন্তব্য সমাজে বিভাজন ও উত্তেজনা বাড়াতে পারে। সেঙ্ক উইগুরকেও অতীতে ইসরায়েলবিষয়ক বক্তব্যের জন্য সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। যদিও তিনি বারবার বলেছেন, তার সমালোচনা কোনো ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়; বরং নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে।
ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তের পর দেশটির ভেতরেই মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। বাকস্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন বলছে, বিতর্কিত মতামত থাকা আর কাউকে দেশে প্রবেশ করতে না দেওয়া এক বিষয় নয়। তারা আশঙ্কা করছে, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে রাজনৈতিক মতের ভিত্তিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের নজির তৈরি করতে পারে। এমনকি অক্সফোর্ড ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও হতাশা প্রকাশ করা হয়েছে। কারণ এর আগে হাসান পাইকার সেখানে বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং কোনো নিরাপত্তা সমস্যা সৃষ্টি হয়নি।
এই ঘটনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর পশ্চিমাবিশ্বে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন ইস্যু নিয়ে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। সেঙ্ক উইগুর ও হাসান পাইকার এই বিতর্কের অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত। ফলে তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, এটি শুধু দুই ব্যক্তির ভ্রমণ বাতিলের ঘটনা নয়; বরং ইসরায়েল-সমালোচনা ও পশ্চিমা গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নের অংশ। অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকারের সমর্থকেরা বলছেন, কোনো ব্যক্তির জনপ্রিয়তা তাকে আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না এবং সরকার জননিরাপত্তার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী এই সিদ্ধান্তকে বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছেন। আবার অন্যরা মনে করছেন, বিতর্কিত বক্তব্যের জন্য এরকম পদক্ষেপ অস্বাভাবিক নয়। অনলাইন আলোচনাগুলোতে বিষয়টি নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, সেঙ্ক উইগুর ও হাসান পাইকার এখন আর কেবল দুই জনপ্রিয় মার্কিন অনলাইন ভাষ্যকার নন। তারা পরিণত হয়েছেন একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতীকে। সেই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে গাজা যুদ্ধ, ইসরায়েল সমালোচনা, পশ্চিমা গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার ভবিষ্যৎ। ব্রিটেনের এই সিদ্ধান্ত হয়তো সাময়িক, কিন্তু এর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অভিঘাত আরও অনেক দিন আন্তর্জাতিক আলোচনায় থাকবে।
সূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, দ্য গার্ডিয়ান, স্কাই নিউজ, লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস ও মিডল ইস্ট মনিটর