যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের গুপ্তচরবৃত্তিমূলক তৎপরতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান মিত্র থেকে পাল্টা-গোয়েন্দা (কাউন্টারইন্টেলিজেন্স) ঝুঁকির সর্বোচ্চ বা ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে।
দুই বর্তমান ও একজন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, পেন্টাগনের ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি সম্প্রতি এই নতুন মূল্যায়ন জারি করেছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে ইসরায়েলের বাড়তি আগ্রহ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিআইএর সাত পৃষ্ঠার একটি নথিতে বলা হয়ে, মানব গোয়েন্দা কার্যক্রম (হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স) এবং প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সক্ষমতা ও তৎপরতা ‘ক্রিটিক্যাল’ পর্যায়ে রয়েছে। এতে এমন কয়েকটি নির্দিষ্ট ঘটনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যা মার্কিন উদ্বেগ বাড়িয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে ইসরায়েল। ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, ‘ইসরায়েল মার্কিন প্রতিষ্ঠান বা সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর গোয়েন্দাগিরি করে না। আমাদের গোয়েন্দা কার্যক্রম শত্রুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়, মিত্রদের বিরুদ্ধে নয়।’
অন্যদিকে পেন্টাগন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। একইভাবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা পুরো প্রতিবেদনকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেন, এর উৎস এমন একজন ব্যক্তি যার প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই।
বিশ্লেষকদের মতে, মিত্র দেশগুলোর মধ্যে গুপ্তচরবৃত্তি অস্বাভাবিক নয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের তৎপরতা প্রচলিত সীমার বাইরে চলে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই উত্তেজনার পেছনে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মতপার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বানিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে ইরান ও লেবানন ইস্যুতে মতবিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন যে এক টেলিফোন আলাপে তিনি নেতানিয়াহুকে ‘উন্মাদ’ বলে সম্বোধন করেছিলেন।
এদিকে এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে কূটনীতিক সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নেতানিয়াহু সরকার প্রকাশ্যে সন্দেহ প্রকাশ করেছে যে ইরান কোনো চুক্তি মেনে চলবে। ফলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই নতুন সতর্কতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ইসরায়েল সফরের সময় অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ। এমনকি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কখনও কখনও অস্থায়ী ফোন (বার্নার ফোন) ও আলাদা কম্পিউটার ব্যবহার করেন এবং হোটেল কক্ষে সংবেদনশীল আলোচনা এড়িয়ে চলেন।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর বিশেষজ্ঞ এমিলি হার্ডলিং বলেন, ‘ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। তারা যুক্তরাষ্ট্র কী করছে তা জানার ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী।’
মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের ইতিহাসে গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে মার্কিন নৌবাহিনীর গোয়েন্দা বিশ্লেষক জোনাথান পোলার্ড ইসরায়েলের কাছে গোপন নথি বিক্রি করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে প্রায় ৩০ বছর কারাভোগ করেন।
তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে যুক্তরাষ্ট্র নিজেও মিত্র দেশগুলোর ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চালিয়ে থাকে। ২০১৩ সালে এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা নথি থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় নেতাদের যোগাযোগেও আড়িপাতা চালিয়েছিল, যার মধ্যে সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর েঞ্জেলা মার্কেলের মোবাইল ফোনও ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ নিয়ে দুই দেশের অবস্থান যখন পুরোপুরি এক নয়, তখন সম্ভাব্য ইসরায়েলি গুপ্তচরবৃত্তি নিয়ে এমন উদ্বেগ ওয়াশিংটন-তেল আবিব সম্পর্কের পারস্পরিক আস্থার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তথ্যসূত্র: এনবিসি নিউজ