এক সপ্তাহের মধ্যে তৃতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে তেহরান। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নেওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এ খবর জানানো হয়েছে।
রোববার ইরান দাবি করে, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান, কাতার ও ওমানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। তেহরানের ভাষ্য, দক্ষিণ উপকূলীয় শহরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বোমা হামলার জবাব হিসেবেই এসব অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
এর আগে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে ইরান। তাদের অভিযোগ, ওয়াশিংটন চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে।
কেন উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালাল ইরান?
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) দক্ষিণ ইরানে রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটিতে তৃতীয় দফায় হামলা চালানোর পর তারা পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে।
অন্যদিকে সেন্টকমের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজে গুলি চালানোর পর এবং প্রণালি বন্ধ ঘোষণার পরই তারা অভিযান জোরদার করে। ওই ঘটনায় জাহাজের একজন নাবিক নিখোঁজ হন বলেও জানায় যুক্তরাষ্ট্র।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, ‘একতরফা চুক্তির যুগ শেষ হয়েছে।’ সামাজিকমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘আমরা বলেছিলাম, চুক্তি মানুন, না হলে মূল্য চুকাতে হবে। বাস্তবতা এখন দরজায় কড়া নাড়ছে।’ পোস্টের সঙ্গে তিনি এমওইউর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের একটি ছবি প্রকাশ করেন, যেখানে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ হয়ে গেছে। এর পরপরই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার পিতার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন।
কীভাবে উত্তেজনা এতদূর গড়াল?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অস্পষ্টতা ছিল, যা নতুন করে সংঘাতের পথ খুলে দেয়।
গত সোমবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ওমান উপকূলে কাতারের একটি এলএনজি ট্যাংকারসহ তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায়।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান। এরপরই ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি বাতিল করেন।
শনিবার রাতে আইআরজিসি একটি কনটেইনার জাহাজে হামলার পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করে। রোববার আরও একটি জাহাজে হামলার কথাও জানায় তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ হামলায় কোথায় আঘাত হানা হয়েছে?
সেন্টকম জানায়, গত সপ্তাহে তৃতীয় দফার অভিযানে ইরানের প্রায় ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।
এসবের মধ্যে ছিল—ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি, নৌ সক্ষমতা, গোলাবারুদ সংরক্ষণাগার, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র।
সেন্টকমের দাবি, তিন রাতের অভিযানে মোট ৩০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে, যাতে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সক্ষমতা দুর্বল করা যায়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবি জানায়, লোরেস্তান প্রদেশের ভেইসিয়ান শহরের উপকণ্ঠ এবং খোন্দাবের একটি সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালিয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলীয় বুশেহর প্রদেশের কর্মকর্তারা জানান, আসালুইয়েহ, দেইর, বুশেহর, দাশতি ও তাঙ্গেস্তানসহ পাঁচটি শহরে হামলা হয়েছে। তবে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও মূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তেহরান।
কোথায় কোথায় পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান?
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের পর থেকেই উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) দেশগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে ইরান।
ওমান
আইআরজিসির দাবি, ওমানের দুকম বন্দরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর জ্বালানি ও সরবরাহ কেন্দ্র লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালানো হয়েছে এবং সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে।
কাতার
ইরান জানায়, কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র ও কমান্ড সেন্টার ধ্বংস করা হয়েছে।
তবে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার সময় ছিটকে পড়া ধ্বংসাবশেষে এক শিশুসহ তিনজন আহত হন।
কুয়েত
ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি, বিস্ফোরকবাহী ড্রোন দিয়ে মার্কিন প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোলাবারুদ ডিপো এবং রাডার স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে।
বাহরাইন
ড্রোন হামলায় মার্কিন যোগাযোগ ব্যবস্থা ও রাডার কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।
জর্ডান
আইআরজিসি জানায়, প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে কমান্ড সেন্টার ও এমকিউ-৯ ড্রোনের হ্যাঙ্গার ধ্বংস করা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে এখন কী পরিস্থিতি?
ইরান জানিয়েছে, অনুমোদনহীন রুট ব্যবহার করায় একটি জাহাজে সতর্কতামূলক গুলি চালানো হয় এবং পরে আরেকটি জাহাজ অচল করে দেওয়া হয়েছে।
আইআরজিসি বলেছে, ‘এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।’
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজে একটি ‘অবৈধ নৌপথ’ তৈরি করার চেষ্টা করছে, যা অঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে।
বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি এই সংকীর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহণ করা হয়। সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর থেকেই এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
তেহরান বলছে, তাদের অনুমোদিত রুট ব্যবহার করেই কেবল জাহাজ চলাচল করতে হবে এবং ওমানের সঙ্গে যৌথভাবেই তারা এই প্রণালি পরিচালনা করতে আগ্রহী।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও জিসিসিভুক্ত দেশগুলো ইরানের এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে হরমুজে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
শনিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ওমান সফর করেন। সেখানে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়।
উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া
হামলার পর রোববার বিভিন্ন দেশে বিমান হামলার সতর্ক সংকেত (সাইরেন) বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
ওমান সরকার জানিয়েছে, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে।
কাতার ইরানের হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন’ এবং আন্তর্জাতিক আইনের ‘প্রকাশ্য লঙ্ঘন’ বলে উল্লেখ করেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিরাপত্তা সতর্কতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করে অপ্রয়োজনীয় চলাচল এড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করা হচ্ছে এবং বিস্ফোরণের শব্দ মূলত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যক্রমের ফল।
বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিমান হামলার সতর্ক সংকেত চালু করে নাগরিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে।