প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র নাউরুর নাম পরিবর্তন করে ‘নাওয়েরো প্রজাতন্ত্র’ করা হয়েছে। দেশটির জাতীয় ভাষায় নামটির বানান ও উচ্চারণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
নাম পরিবর্তনের সঙ্গে দেশটির আন্তর্জাতিক কোডও ‘NRU’ থেকে ‘NRO’ করা হবে। এত দিন দেশটির নাগরিকদের ‘নাউরুয়ান’ বলা হলেও এখন থেকে তাদের ‘দেই-নাওয়েরো’ নামে অভিহিত করা হবে। বিদেশে প্রচলিত ‘নাউরু’ (নাও-রু) উচ্চারণের বদলে নতুন নামটি উচ্চারিত হবে ‘নাও-য়েরো’।
সরকারের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, এ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের প্রত্যন্ত দ্বীপরাষ্ট্রটি তার ঐতিহ্যবাহী নাম ফিরে পেল।
এর আগে, এক সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, স্থানীয় নামটি বিদেশিদের উচ্চারণে সুবিধার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ‘নাউরু’ নামটি ব্যবহৃত হয়ে আসছিল, স্থানীয়দের ইচ্ছায় নয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে পার্লামেন্টে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট ডেভিড অ্যাডিয়াং বলেছিলেন, ‘এই পরিবর্তনের মাধ্যমে আমাদের দেশের ঐতিহ্য, ভাষা ও জাতীয় পরিচয়কে আরও যথাযথভাবে সম্মান জানানো হবে।’
সাম্প্রতিক ঘোষণায় প্রেসিডেন্ট অ্যাডিয়াং জানান, নাম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন করে জাতীয় গৌরবের সূচনা হয়েছে। মে মাসে নাম পরিবর্তনের পক্ষে ভোট হওয়ার পর এটি নিশ্চিত করতে গণভোট আয়োজনের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।
তবে গত সপ্তাহে দেওয়া এক বিবৃতিতে সরকার জানায়, ব্যাপক আলোচনার পর আইনপ্রণেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এ বিষয়ে গণভোটের প্রয়োজন নেই। বিবৃতিতে বলা হয়, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত জানা গেলেও ‘নাওয়েরো’ নামটি কখনো হারিয়ে যায়নি। বরং এটি পুরোপুরি গ্রহণ করার অপেক্ষায় ছিল।
সরকার আরও বলেছে, ‘নাওয়েরো’ নামটি ইতোমধ্যে দেশটির মানুষের পরিচয়ের অংশ, জাতীয় প্রতীকে রয়েছে এবং স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নামটি ব্যবহারের অনুমোদন সংবিধানেও রয়েছে।
নাম পরিবর্তনের ফলে নাওয়েরোর জাতীয় উড়োজাহাজ ও জাহাজের নামেও পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়, বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে নতুন নামটি স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে দেশটিকে নতুন নাম ‘নাওয়েরো’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, জুন মাসে জাতিসংঘের কাছে নাম পরিবর্তনের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অঞ্চলটিতে থাকা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দূতাবাসগুলোর ওয়েবসাইটেও দেশটির নতুন নাম ‘নাওয়েরো’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রায় ১২ হাজার মানুষের দেশ নাওয়েরো জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। এর ছেটে ছোট রয়েছে টুভালু ও ভ্যাটিকান সিটি। ক্ষুদ্র এই প্রবাল-চুনাপাথরের দ্বীপটি একসময় জার্মানির উপনিবেশ ছিল। পরে অস্ট্রেলিয়ার প্রশাসনের অধীনে থাকার পর ১৯৬৮ সালে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
দেশটির ইতিহাস নানা উত্থান-পতনে ভরা। ১৯৭০-এর দশকে ফসফেট খনন থেকে দ্বীপটিতে বিপুল সম্পদ আসে। তবে এ শিল্প ধসে পড়ার পর ১৯৯০-এর দশকে দেশটি প্রায় অর্থনৈতিক ধ্বংসের মুখে পড়ে।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি নাওয়েরো। এ পরিস্থিতিতে সমুদ্রের আগ্রাসন থেকে মানুষ ও অবকাঠামো নিরাপদে সরিয়ে নিতে অর্থ জোগাড়ের লক্ষ্যে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করছে সরকার। এ জন্য অর্থের বিনিময়ে নাগরিকত্ব দেওয়ার একটি কর্মসূচিও চালু করা হয়েছে।
নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক অতীত থেকে সরে এসে ঐতিহ্যবাহী নাম গ্রহণ করা দেশগুলোর তালিকায় এবার যুক্ত হলো নাওয়েরো। এর আগে ২০১৮ সালে আফ্রিকার ক্ষুদ্র রাজ্য সোয়াজিল্যান্ড নাম পরিবর্তন করে এসওয়াতিনি হয়। আবার নিজস্ব পরিচিতিকে গুরুত্ব দিতে ২০২২ সালে জাতিসংঘকে দেশের নাম ‘তুর্কিয়ে’ হিসেবে ব্যবহারের অনুরোধ করে তুরস্ক।