লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় ঢুকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা খুবই বিরল। তবে যুক্তরাষ্ট্র অতীতেও এমন হটকারী কাণ্ড ঘটিয়েছে। ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ও পানামার প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগাকেও নিজ দেশেই বন্দি হতে হয়েছিল মার্কিন বাহিনীর হাতে। ঠিক মাদুরোর মতোই ভাগ্যবরণ করতে হয়েছিল তাদেরও।
তবুও অনেকেই মাদুরোর অপহরণকে বেনজির বলে মনে করছেন। প্রশ্ন উঠছে, আদৌ ভেনেজুয়েলায় ঢুকে মাদুরোকে বন্দি করার অধিকার আছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের? আন্তর্জাতিক আইনই-বা কী বলছে?
নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করায় বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। নিন্দা জানিয়ে খোদ মার্কিন মাটিতে অবস্থান করা জাতিসংঘও। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু ‘বন্ধু’ দেশ বা রিপাবলিকানেরা ট্রাম্পের এই হটকারী পদক্ষেপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেও অধিকাংশই এর নিন্দা জানিয়েছেন। তাদের মতে, এভাবে মাদুরোকে বন্দি করা ভেনেজুয়েলার আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বে আঘাত হানা ছাড়া কিছুই নয়। অনেক দেশই এ বিষয়ে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। কিন্তু প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ‘বিষহীন সাপে’র মতোই খ্যান্ত গেছে। বলেছে, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ বিশ্বের দরবারে একটি ‘বিপজ্জনক নজির’।
১৯৪৫ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘের এক সনদ স্বাক্ষরিত হয়। সনদের অনুচ্ছেদ ২(৪) অনুযায়ী, সব দেশকে অন্য দেশের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। জাতিসংঘের সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য। তাতে বলা হয়েছে, ‘সকল সদস্য তাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্য দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ করতে পারবে না।’ অর্থাৎ, স্পষ্টতই যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের সনদ লঙ্ঘন করেছে।
ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের প্রতিষ্ঠাতা তথা সিয়েরা লিওনে জাতিসংঘের যুদ্ধাপরাধ আদালতের সাবেক সদস্য জিওফ্রে রবার্টসনের মতে, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাস্তবে জাতিসংঘের নিয়ম লঙ্ঘন করেছে। আগ্রাসনের অপরাধে অপরাধী তারা। নুরেমবার্গের আদালত এ ধরনের ঘটনাকে সর্বোচ্চ অপরাধ হিসাবে বর্ণনা করেছে।’
সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ তথা নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেরেমি পল সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘কখনওই বলা যাবে না যে এটা কোনও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার অভিযান ছিল। আসলে এই অভিযানের কোনও অর্থই নেই।’ আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে, অন্য কোনও দেশের রাষ্ট্রপ্রধান আটক করার কোনও ক্ষমতা নেই যুক্তরাষ্ট্রের।
তবে মাদুরোকে আটক করার নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কিছু যুক্তি রয়েছে। হোয়াইট হাউস বার বার দাবি করেছে, নির্বাচনে কারচুপি করে ক্ষমতায় এসেছেন নিকোলাস মাদুরো। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে মার্কিন প্রশাসন। এ ছাড়াও, মাদক পাচার বা সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়ার মতো অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মাদুরোকে গ্রেপ্তার করার জন্য বিচার বিভাগ সহায়তা চেয়েছিল বলেও দাবি করে মার্কিন প্রশাসন। মাদুরোকে আটক করা কোনও সামরিক অভিযান নয়, বিচার বিভাগের অনুরোধেই এই পদক্ষেপ।
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের যুক্তির সঙ্গে আবার ‘সহমত’ নন ট্রাম্প। তিনি সরাসরি মাদুরোর বিরুদ্ধে তেল চুরির অভিযোগ এনেছেন। মাদুরোকে আটক করার ঘটনা প্রসঙ্গে দর্পের সুরে শনিবার রাতে ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যা অর্জন করেছে, বিশ্বের কোনও দেশ তা করতে পারেনি। সত্যি বলতে, অল্প সময়ের মধ্যেই ভেনেজুয়েলার সমস্ত সামরিক ক্ষমতা শক্তিহীন হয়ে পড়েছিল।’
ট্রাম্প আরও জানান, ভেনেজুয়েলার জ্বালানিভান্ডার দখলের জন্য শীঘ্রই মার্কিন তেলের কোম্পানিগুলোকে অনুমোদন দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি। ট্রাম্প জানিয়েছেন, মার্কিন সংস্থাগুলো এই প্রকল্পে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করবে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের পর অনেকেই দাবি করছেন, ট্রাম্পের লক্ষ্যই ছিল ভেনেজুয়েলার তেলের ভান্ডারের উপর। সেই কারণে এই অভিযান।