লিবিয়ার সাবেক নেতা কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফিকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। লিবিয়ান নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুসারে, ৫৩ বছর বয়সী এই ব্যক্তির মৃত্যুর খবর মঙ্গলবার তার রাজনৈতিক দলের প্রধান নিশ্চিত করেছেন, যাকে একসময় ব্যাপকভাবে তার বাবার উত্তরাধিকারী হিসেবে মনে করা হতো।
গাদ্দাফির আইনজীবী সংবাদ সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, একটি ‘চার সদস্যের কমান্ডো’ ইউনিট জিনতান শহরে তার বাড়িতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, যদিও এই হামলার পেছনে কে বা কারা থাকতে পারে তা এখনো স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে এই ঘটনার পৃথক আরেকটি বর্ণনায়, গাদ্দাফির বোন লিবিয়ান টেলিভিশনে বলেছেন, তিনি লিবিয়া-আলজেরিয়া সীমান্তের কাছে নিহত হয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফিকে তার বাবার পর দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ভয়ঙ্কর ব্যক্তি হিসেবে দেখা হতো। তার বাবা মুয়াম্মার গাদ্দাফি ১৯৬৯ সাল থেকে ২০১১ সালে এক বিদ্রোহের সময় ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত লিবিয়া শাসন করেছিলেন। অন্যদিকে ১৯৭২ সালে জন্মগ্রহণকারী সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি ২০০০ সাল থেকে গাদ্দাফি শাসনের পতন পর্যন্ত পশ্চিমাবিশ্বের সঙ্গে লিবিয়ার সম্পর্ক স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
বাবার ক্ষমতাচ্যুতির পর সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি জিনতান শহরের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী মিলিশিয়া বাহিনীর হাতে প্রায় ছয় বছর ধরে কারাগারে বন্দি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নৃশংসভাবে দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের অভিযোগ ছিল। ২০১১ সালে বিরোধীদের বিক্ষোভ দমনে কঠোর ভূমিকার কারণে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মুখোমুখি করতে চেয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। এমনকি দেশটির পশ্চিমে অবস্থিত ত্রিপোলি শহর, যার নিয়ন্ত্রণ জাতিসংঘ-সমর্থিত সরকারের হাতে, সেখানকার একটি আদালত ২০১৫ সালে তার অনুপস্থিতিতেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিন্তু দুই বছর পর পূর্বাঞ্চলীয় শহর তোব্রুকের মিলিশিয়া তাকে সাধারণ ক্ষমা আইনের আওতায় মুক্তি দেয়।
গাদ্দাফির উৎখাতের পর থেকে বিভিন্ন মিলিশিয়া নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে লিবিয়া ও বর্তমানে দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকারের মধ্যে বিভক্ত। তার বাবা দেশটির নেতা থাকাকালীন সরকারে কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা না থাকা সত্ত্বেও উচ্চ-স্তরের আলোচনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি, যার মধ্যে এমন কিছু ছিল, যে কারণে তার বাবা নিজের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিও ত্যাগ করেছিলেন।
এই ধরনের চুক্তির ফলে উত্তর আফ্রিকার দেশটির ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল এবং কেউ কেউ গাদ্দাফিকে একজন সংস্কারবাদী ও পরিবর্তিত লিবিয়ার গ্রহণযোগ্য মুখ বলে মনে করেছিলেন।
এ ছাড়া সাইফ আল-ইসলাম সবসময় অস্বীকার করেছেন, তিনি তার বাবার কাছ থেকে ক্ষমতা উত্তরাধিকার সূত্রে পেতে চান। তিনি বলেছিলেন, ক্ষমতার লাগাম ‘একটি খামার নয় যা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায়’।
তবে ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণাও দিয়েছিলেন সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি। পরবর্তীতে ওই নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদন বলছে, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে পড়া সাইফ আল-ইসলাম অনর্গল ইংরেজি বলেন এবং পশ্চিমা মহলে একসময় তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল। তবে ২০১১-এর ঘটনাবলীর সময় বাবার পক্ষ নেওয়ার পর তার সেই ভাবমূর্তি অনেকটাই বদলে যায়।