মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভারতের কূটনীতি এখন এক অগ্নিপরীক্ষার মুখে। একদিকে দীর্ঘদিনের কৌশলগত বন্ধু ইরান, অন্যদিকে প্রবল শক্তিশালী ইসরায়েল ও পশ্চিমাবিশ্ব—এই দুই বিপরীত মেরুর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে গিয়ে দিল্লির অবস্থা এখন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’। বিশেষ করে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক উত্তজনা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
সম্প্রতি ব্রিটেনের এক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য পরিষ্কার করেছেন। ভারতের পতাকাবাহী দুটি তেলবাহী ট্যাংকার শনিবার যখন হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছিল, তখন বিশ্বজুড়ে গুঞ্জন ওঠে, তেহরানের সঙ্গে কোনো গোপন সমঝোতা বা ‘কুইড প্রো কু’তে জড়িয়েছে ভারত।
জয়শঙ্কর অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এই জল্পনা উড়িয়ে দিয়ে জানান, ‘ভারতের জাহাজ নির্বিঘ্নে পার হওয়ার জন্য ইরানের সঙ্গে কোনো বিশেষ দেনাপাওনা বা চুক্তিতে যেতে হয়নি। ভারত তার নিজস্ব কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমেই যোগাযোগ বজায় রাখছে।’
সংকটের মূলে ভূ-রাজনীতি
ভারতের জন্য ইরান কেন গুরুত্বপূর্ণ? এর উত্তর লুকিয়ে আছে চাবাহার বন্দর ও রাশিয়ার সঙ্গে সংযোগকারী ইন্টারন্যাশনাল নর্থ-সাউথ ট্রান্সপোর্ট করিডোরের মধ্যে। কিন্তু সমস্যা বেঁধেছে যখন ইরান-ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে। ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের গভীর প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। আবার লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় ভারতের বাণিজ্যতরিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারত বাধ্য হয়ে সেখানে রণতরি মোতায়েন করেছে।
দিল্লির সামনে এখন তাই তিনটি প্রধান বাধা
জ্বালানি নিরাপত্তাই ভারতের প্রথম অগ্রাধিকার। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতের তেলের একটি বড় অংশ আসে। হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হলে ভারতের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে।
দ্বিতীয়ত, প্রবাসীদের সুরক্ষা। মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক লাখ ভারতীয় শ্রমিক কাজ করেন। বিশাল রেমিট্যান্স দেশে আনেন তারা। যুদ্ধের বিস্তার মানেই তাদের জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মুখে।
তৃতীয়ত, কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করা ভারতের জন্য কঠিন একটি বিষয় এখন। কারণ ওয়াশিংটন চায় ভারত ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিক। কিন্তু তেহরানকে চটালে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ও মধ্য এশিয়ায় প্রবেশাধিকার হারাবে দিল্লি।
জয়শঙ্করের কথায় এটা স্পষ্ট যে ভারত কোনো পক্ষ নিতে চায় না। বরং ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। তবে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনা যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে দিল্লির এই ভারসাম্য রক্ষার খেলা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নিয়ে সন্দিহান বিশ্লেষকরা। তখন তাদের একটি পক্ষ নিতেই হবে।