২৯ এপ্রিল ২০২৬। ইতিহাসের ধুলো ঝাড়লে এক শতাব্দী আগে ফিরে যেতে হয় আমাদের। ১৯১৯ সালের তপ্ত এপ্রিলে জালিয়ানওয়ালাবাগের সেই রক্তক্ষয়ী গণহত্যার খবর যখন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে পৌঁছায়, তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। তার সেই বিখ্যাত প্রতিবাদী চিঠিটি তিনি ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডকে পাঠিয়েছিলেন মে মাসের ৩০ তারিখে। চিঠিতে তিনি পরিষ্কার লিখেছিলেন, ‘সম্মান ও উপাধি আমাদের জন্য লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে’। সেই সময় থেকেই আমরা পাঠ্যবই বা ইতিহাসে জেনে এসেছি যে রবীন্দ্রনাথ তার ‘নাইট’ উপাধিটি পুরোপুরি বর্জন করেছিলেন।
কিন্তু সম্প্রতি ইতিহাস গবেষক ও ফ্যাক্ট-ওয়াচসহ বিভিন্ন সূত্রের অনুসন্ধানে কিছু নতুন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে যা আমাদের চিরচেনা এই ধারণাকে কিছুটা নাড়িয়ে দেয়।
রবীন্দ্রনাথ নাইটহুড বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন, এটি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি নিজে ভাইসরয়কে চিঠি লিখে এই ‘নিষ্কৃতি’ চেয়েছিলেন। কিন্তু ফ্যাক্ট-ওয়াচ এবং মুকুল দে আর্কাইভের তথ্য বলছে, এই ঘটনার প্রায় ১৩ বছর পরে অর্থাৎ ১৯৩২ সালে কলকাতায় রবীন্দ্রনাথের একটি চিত্রপ্রদর্শনী হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই প্রদর্শনীর ক্যাটালগ এবং পোস্টারে রবীন্দ্রনাথের নামের আগে ‘স্যার’ উপাধিটি বড় করে লেখা ছিল। এমনকি ওই প্রদর্শনীর টাকাপয়সার লেনদেনের দলিলেও এই উপাধির ছোঁয়া পাওয়া যায়। প্রশ্ন ওঠে, কবি যে উপাধি ১৯১৯ সালে ঘৃণাভরে বর্জন করলেন, ১৯৩২ সালে কেন সেটি আবার তার নামের পাশে ফিরে এলো?
এখানেই তৈরি হয়েছে এক অমীমাংসিত রহস্য। কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন, রবীন্দ্রনাথ তার দিক থেকে উপাধি বর্জন করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের দাপ্তরিক নথিতে বা গেজেটে হয়তো সেটি কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়নি। ব্রিটিশ সরকার হয়তো কবির সেই দাবিকে আমলেই নেয়নি, যার ফলে তাদের পরবর্তী দাপ্তরিক কাগজপত্রে রবীন্দ্রনাথ ‘স্যার’ হিসেবেই থেকে গিয়েছিলেন। আবার অনেকের মতে, ১৯৩২ সালের ওই প্রদর্শনীর আয়োজকরা হয়তো ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের মন রক্ষা করতে বা প্রদর্শনীর ‘মর্যাদা’ বাড়াতে কবির অমতেই বা অজান্তেই ওই উপাধিটি ব্যবহার করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের জন্য ‘নাইট’ উপাধিটি কখনোই বড় ছিল না। নোবেল পুরস্কার জেতার পর ব্রিটিশরা যখন তাকে এই সম্মানে ভূষিত করে, তখন সেটি তার কাছে ছিল শুধুই একটি রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু দেশের মানুষের রক্ত যখন জালিয়ানওয়ালাবাগে ঝরলো, তখন সেই রাজকীয় তকমা কবির কাছে কাঁটার মতো বিঁধতে শুরু করে। তিনি যখন ভাইসরয়কে চিঠি লিখলেন, সেটি ছিল মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গালে একটি নৈতিক চপেটাঘাত। রবীন্দ্রনাথের প্রতিবাদটি ছিল হৃদয়ের, আত্মার।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যখন এই ঘটনাটি বিশ্লেষণ করি, তখন আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, দাপ্তরিক কাগজে ‘স্যার’ লেখা থাকলো কি থাকলো না, তার চেয়েও বড় সত্য হলো কবির সেই সাহসী পদক্ষেপ। ১৯১৯ সালের সেই উত্তাল সময়ে একজন বিশ্ববরেণ্য কবি হয়েও রাজরোষকে তোয়াক্কা না করে তিনি যেভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সেটাই তার শ্রেষ্ঠ পরিচয়। ইতিহাসের অলিগলিতে হয়তো দাপ্তরিক মারপ্যাঁচে ‘স্যার’ উপাধিটি থেকে গেছে, কিন্তু বাংলার মানুষের কাছে রবীন্দ্রনাথ কোনো ‘নাইট’ নন, তিনি স্রেফ চিরকালীন ‘বিশ্বকবি’।