এই সময়ের বহুল আলোচিত বই ‘কবিতার ইশতেহার’ নিয়ে কথা হয় বইটির লেখক মিজান মাহমুধ এর সঙ্গে। নাগরিক প্রতিদিন-এর পক্ষ থেকে স্বাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জিয়াউল জিয়া।
নাগরিক প্রতিদিন: একদম সরাসরিভাবেই জানতে চাই— আপনি ‘কবিতার ইশতেহার’ বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন? এটি কি কেবল কবিতার বই, নাকি অন্য কিছু?
মিজান মাহমুধ: এটা বই না—একটা ঘোষণা। আরও স্পষ্ট করে বললে, এটি— একটি স্বপ্নজাত রাস্ট্রের খসড়া। কবিতা এখানে সৌন্দর্যের জন্য না, বরং অবস্থানের জন্য। আমি বলতে চেয়েছি, কবিতা এখন আর শুধু রূপক বা প্রেমের খেলা না; এটা এক ধরনের প্রতিরোধ, এক ধরনের চিৎকার। ‘ইশতেহার’ শব্দটা আমি ইচ্ছাকৃতভাবে নিয়েছি—কারণ আমি চেয়েছি কবিতা আর নীরব না থাকুক।
নাগরিক প্রতিদিন: আপনি এই বইটিকে তবে কী বলবেন? কবিতার বই, নাকি রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো?
মিজান মাহমুধ: না, এটা কোনো দলের ইশতেহার না। তাই এটিকে রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো বলা যাবে না। আবার শুধু নির্দোষ অলংকারযুক্ত কবিতাও বলা যাবে না। আপনি এটাকে বলতে পারেন, কবিতার ভাষায় রাষ্ট্রচিন্তা। কারণ আমি আইন লিখিনি—আমি অনুভবের সংবিধান লিখেছি।
নাগরিক প্রতিদিন: আপনি ‘সংবিধান’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন—এটা কি ইচ্ছাকৃত রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করার জন্য?
মিজান মাহমুধ: মোটেও তা না, উত্তেজনা তৈরি করা আমার উদ্দেশ্য না। ‘সংবিধান’ এখানে ক্ষমতার দলিল না—বরং নৈতিক কল্পনা। একটা রাষ্ট্র কেমন হওয়া উচিত, আমি সেটা কবিতার ভাষায় দেখাতে চেয়েছি।
নাগরিক প্রতিদিন: তার মানে আপনি কি কবিতাকে রাজনৈতিক করেছেন। কিন্তু এটি করতে গিয়ে আপনি কি কবিতার কাব্যিক ধারা বজায় রাখতে পেরেছেন?
মিজান মাহমুধ: আমি এই বিভাজনটাই মানি না। কবিতা যদি মানুষের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে সেটা মৃত ভাষা। আবার যদি শুধু স্লোগান হয়ে যায়, সেটাও কবিতা না। আমি দুইয়ের মাঝখানে একটা বিপজ্জনক জায়গায় দাঁড়াতে চেয়েছি—যেখানে কবিতা মানুষের কথা বলে, কিন্তু সত্য বলে।
নাগরিক প্রতিদিন: ‘নির্মম ইতিহাস’ কবিতাটি অনেক সরাসরি রাজনৈতিক অভিযোগের মতো শোনায়—এটা কি কবিতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে?
মিজান মাহমুধ: কবিতা সীমা মানে না। ইতিহাস যখন রক্ত, ভুল, আর স্মৃতির ভেতর দিয়ে যায়, তখন কবিতাও রিপোর্ট হয়ে যায়। আমি সেটা এড়িয়ে যাইনি।
নাগরিক প্রতিদিন: ‘কবিতার ইশতেহার’ বইয়ে আমরা অনেক ভাষার ‘রুক্ষতা’ দেখেছি— এটা কি সচেতন ভাঙন?
মিজান মাহমুধ: রুক্ষতা না— এটা বাস্তবতার অনুচ্চারিত ভাষা। কাব্যিক ভাষা অনেক সময় মিথ্যা ঢেকে রাখে। আমি সেই ঢাকনা খুলতে চেয়েছি। রুক্ষতা কখনেই নান্দনিকতা নয়, আমি কেবল সত্যের ঘর্ষণ দিয়েছি মাত্র।
নাগরিক প্রতিদিন: আপনি কি মনে করেন বর্তমান বাংলা কবিতা সংকটে আছে?
মিজান মাহমুধ: সংকট শব্দটা অনেক কোমল। আমি বলব—বাংলা কবিতা এখন এক ধরনের আত্মতৃপ্ত স্থবিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। সবাই সুন্দর লিখতে চায়, কিন্তু কেউ ঝুঁকি নিতে চায় না। কবিতা যখন ঝুঁকি হারায়, তখন সেটা ক্যালিওগ্রাফি হয়ে যায়—জীবন নয়। আমার ধারণা বাংলা কবিতার এখন ক্যালিওগ্রাফিক যুগ চলছে।
নাগরিক প্রতিদিন: আপনার কবিতায় ধর্ম, রাষ্ট্র বা সমাজ—এদের প্রতি এক ধরনের প্রশ্ন আছে। আপনি কি মানুষের বিশ্বাস ভাঙতে চান?
মিজান মাহমুধ: আমি বিশ্বাস ভাঙতে চাই না— আমি চাই মানুষ বিশ্বাস সচেতন হোক। অন্ধ বিশ্বাস ভয়ংকর। আমি বরং ভিন্নভাবে বলতে চাই— কবিতা যদি প্রশ্ন না তোলে, তাহলে সেটা প্রশংসাপত্র হয়ে যায়, সাহিত্য না।
নাগরিক প্রতিদিন: এক জায়গায় আপনি লিখেছেন— ‘কে বঙ্গবন্ধু আর কে স্বৈরাচার—সবকিছু এক হয়ে গেছে অক্ষরের বিষে।’ এটা খুব তীব্র বক্তব্য। এখানে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
মিজান মাহমুধ: আমি বিভ্রান্ত সময়কে দেখাতে চেয়েছি। ইতিহাস যখন রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন ভাষাও দূষিত হয়। তখন একই প্রতীককে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করে— ফলে সত্য-অসত্যের রেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়।
নাগরিক প্রতিদিন: আপনি নিজেকে কবি বলবেন, নাকি ইশতেহারকার?
মিজান মাহমুধ: কবি শব্দটা অনেক পুরনো হয়ে গেছে, কিন্তু আমি সেটা অস্বীকার করি না। আমি বলব— আমি ইশতেহার লিখেছি, যার মাধ্যম কবিতা। আমার পরিচয় কবিতার চেয়ে বড় না, কিন্তু কবিতার দায়িত্ব আমার চেয়ে অনেক বড়।
নাগরিক প্রতিদিন: ‘কবিতার ইশতেহার’ এর মাধ্যমে আপনি পাঠকের কাছে কী প্রত্যাশা করেন?
মিজান মাহমুধ: আমি চাই এই কবিতা পড়ে পাঠক আরাম না পাক। বরং কবিতা পড়ে যদি কেউ অস্বস্তি অনুভব না করে, তাহলে আমি ব্যর্থ। আমি চাই পাঠক নিজের ভেতর একটা প্রশ্ন নিয়ে বের হোক— উত্তর নিয়ে না।
নাগরিক প্রতিদিন: শেষ প্রশ্ন করতে চাই—‘কবিতার ইশতেহার’ শেষ পর্যন্ত কী ঘোষণা করে?
মিজান মাহমুধ: এটা ঘোষণা করে যে কবিতা এখনো মৃত না, কিন্তু তাকে বাঁচতে হলে ভদ্রতা ছাড়তে হবে, নিরাপত্তা ছাড়তে হবে, এবং নিজের ঝুঁকির ভেতর নামতে হবে। কবিতা যদি ঝুঁকি না নেয়, তাহলে সেটা শুধু শব্দের সাজ কিংবা ক্যালিওগ্রাফ।
নাগরিক প্রতিদিন: ব্যস্ততার মাঝেও সময় দেয়ার জন্যে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন।
মিজান মাহমুধ: আপনিও ভালো থাকবেন।