রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় অনুমোদিত নকশার বাইরে ভবন নির্মাণ ও আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে ১৫ দিনের মধ্যে অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়ে নোটিশ জারি করেছিল রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। তবে নোটিশ জারির দুই মাস পার হলেও এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজউকের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে আবাসিক এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও নকশাবহির্ভূত সাততলা ভবন টিকে আছে। তাদের দাবি, রাজউককে ‘ম্যানেজ’ করেই এলাকায় একাধিক অবৈধ ভবনের কার্যক্রম চলছে।
রাজধানীর বনশ্রী এলাকার ইস্টার্ন হাউজিং রোড নম্বর–০৬, ব্লক–এ, প্লট নম্বর–১১–তে অবস্থিত সাততলা ভবনটির মালিক সাকিনা আক্তার। রাজউকের জোন–৬/১ কার্যালয় থেকে গত পয়লা জানুয়ারি ভবনটির অবৈধ অংশ ১৫ দিনের মধ্যে অপসারণের নির্দেশ দিয়ে নোটিশ দেওয়া হয়। তবে সাকিনা আক্তারের দাবি, তার নামে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য আগে থেকে জানতেন না এবং তিনি কোনো চিঠিও পাননি।
সাকিনা আক্তার জানান, যদি সত্যিই কোনো নোটিশ ইস্যু হয়ে থাকে, তাহলে তিনি সরাসরি রাজউকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি জানবেন। তিনি আরও জানান, বনশ্রীতে তার ফ্ল্যাট নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন নিয়েই কাজ করা হয়েছে এবং নকশাবহির্ভূত নির্মাণের অভিযোগ সঠিক নয়। তার ভাষায়, নিয়মের বাইরে কিছু করলে রাজউক অবশ্যই তাকে জানাতো।
এ বিষয়ে রাজউকের অথরাইজড কর্মকর্তা জোন–৬/১–এর আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘নোটিশ দেওয়া হয়ে থাকলে তা ফরমালি দেওয়া হয়েছে।’ তবে বিস্তারিত জানতে অফিস সময়ের মধ্যে যোগাযোগ করতে হবে বলেও জানান তিনি।
নোটিশ দেওয়া হলেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—জানতে চাইলে তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। জানতে চান, অভিযোগকারীরা কারা। পরে তিনি বলেন, ‘অফিস টাইমে এ বিষয়ে কথা বলা যাবে।’ ফোনে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগের বিষয়ে বনশ্রীর ইস্টার্ন হাউজিং এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মোসলেম জানান, এ ব্লকে কিছু বাড়িতে অবৈধ নির্মাণের অভিযোগ আছে। কিছু ভবন রাজউকের প্ল্যান না মেনে করা হয়েছে এবং কোথাও কোথাও ফাঁকা জায়গা দখল করে বাড়িঘর করা হয়েছে।
তিনি জানান, মাঝে মাঝে রাজউকের কর্মকর্তারা এসে ভবন পরিদর্শন করে চলে যান, এরপর কী হয়—তা তারা জানতে পারেন না।
মোসলেম আরও জানান, ‘সাধারণ মানুষের বাড়ির বিষয়ে মাঝেমধ্যে নানা অজুহাতে হয়রানির চেষ্টা করা হয়। তবে কিছু কিছু বাড়ির ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের নিয়মিত আসা–যাওয়া দেখা যায়। তারা বাড়িওয়ালাদের সঙ্গে কী আলোচনা করেন, সেটি স্থানীয়রা জানেন না।’
ব্লক–এ-এর ১১ নম্বর প্লটের ভবন প্রসঙ্গে তিনি জানান, শুনেছেন ১ জানুয়ারি ভবন ভাঙার নোটিশ এসেছে। কিন্তু এখনো কোনো ভাঙার কাজ হয়নি। প্ল্যানের বাইরে কিছু থাকলে রাজউক ব্যবস্থা নেবে—এটাই তাদের প্রত্যাশা।
এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সংবাদ সংগ্রহের সময় সাকিনা আক্তারকে বড় বোন দাবি করে বর্তমানে লন্ডনে অবস্থানরত ডিএমপির সাইবার অপরাধ তদন্ত বিভাগের সাবেক এসপি মো. নাজমুল ইসলাম প্রতিবেদককে ফোন দিয়ে বলেন, এ বিষয়ে নিউজ করার ক্ষেত্রে যেন বিবেচনা করা হয়।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি তার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি কোনো সাধারণ খবর নয় এবং সংবাদ তৈরি করার সময় পারিবারিক মান–সম্মান রক্ষার বিষয়টি মাথায় রাখার অনুরোধ জানান।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, সাংবাদিকরা তাদের কাজ করবেন—এ বিষয়ে তার আপত্তি নেই।
রাজউকের জারি করা নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ভবনটি নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল ১৪ জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে। তবে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্ধারিত সেটব্যাক না রেখে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে। চারদিকেই নির্ধারিত দূরত্বের চেয়ে কম জায়গা রেখে অতিরিক্ত অংশ নির্মাণের তথ্য নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা, নির্ধারিত ফরমে রাজউককে অবহিত না করা এবং নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ঘাটতির অভিযোগও তোলা হয়েছে। এসব কারণে ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এবং ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করে ১৫ দিনের মধ্যে অবৈধ অংশ অপসারণ ও বাণিজ্যিক ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়।