অনলাইন বাজারে ‘অস্ত্র’
আকাশে বাঁকা চাঁদ জাগলেই মনে পড়ে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ঈদুল আযহা। ঘরে ঘরে চলে পশুর যত্ন আর মাংস প্রস্তুতের সরঞ্জাম গোছানোর ধুম। এক সময় কামারশালার কয়লার আগুন আর হাতুড়ির শব্দে জানান দিত ঈদের আগমনী বার্তা। কিন্তু যান্ত্রিক এই সময়ে সেই শব্দের প্রতিধ্বনি এখন শোনা যাচ্ছে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে। অনলাইনে ছুরি-চাকুর রমরমা বাজার যেমন এনেছে স্বস্তি, তেমনি পর্দার আড়ালে ঘনীভূত হচ্ছে শঙ্কার কালো মেঘ।
ফেসবুক কিংবা ই-কমার্স সাইটে এখন বাহারি ডিজাইনের ছুরি, চাপাতি আর চাকু সাজানো। মাউসের একটি ক্লিকেই ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে চকচকে এসব অস্ত্র। কোরবানির পশু জবাইয়ের জন্য যা প্রয়োজনীয়, সেই একই অস্ত্র কি তবে অন্য কোনো অন্ধকার গলির ঠিকানাতেও পৌঁছে যাচ্ছে না তো? কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই অস্ত্রের এই অবাধ প্রাপ্তি জননিরাপত্তাকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে এক বড়সড় প্রশ্নের মুখে।
রাজধানীর ম্যাপে এখন ভয়ের নাম মোহাম্মদপুর। পুলিশের তথ্যানুযায়ী, ঢাকায় ছিনতাইয়ের যে ৪৩২টি ‘হটস্পট’ রয়েছে, তার মধ্যে শীর্ষে এই এলাকাটি। শয়ে শয়ে ছিনতাইকারী দিনে-দুপুরে ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করছে সাধারণ মানুষকে। ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র। প্রশ্ন উঠছে, এই যে শত শত ধারালো অস্ত্র অপরাধীদের হাতে পৌঁছাচ্ছে, তার কতটা আসছে অনলাইনের এই নিয়ন্ত্রণহীন বাজার থেকে?
র্যাব-পুলিশের জালে অপরাধীরা ধরা পড়লেও আইনের ফাঁক গলে তারা ফিরে আসছে রাজপথে। আর ফিরে এসেই আবার হাতের কাছে পেয়ে যাচ্ছে নতুন অস্ত্র। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, অনলাইনে পরিচয় যাচাই ছাড়া এসব অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে অপরাধ দমন হবে আরও কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। সাধারণের রান্নার সরঞ্জাম আর অপরাধীর খুনের অস্ত্র, উভয়ই যখন একই উৎস থেকে সহজে মিলছে, তখন জননিরাপত্তা যেন এক আলগা সুতোয় ঝুলছে।
বিক্রেতাদের দাবি, এটি কেবল মৌসুমী চাহিদা মেটানোর একটি সহজ মাধ্যম। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন অন্য কথা। তাদের মতে, ডিজিটাল এই বাণিজ্যে কেবল মুনাফা নয়, প্রয়োজন কঠোর নজরদারি। ক্রেতার পরিচয় যাচাই আর বিক্রেতার নিবন্ধনের শিকল না পরালে কোরবানির আনন্দের আড়ালে অস্ত্রের এই ঝিলিক হয়তো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করবে নাগরিক জীবনে।
ঈদের খুশির মাঝে কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়, কোনো পথচারী যেন ছিনতাইকারীর চাপাতির তলায় প্রাণ না দেয়, সেই দায় এখন আমাদের সবার। প্রযুক্তির ডানায় চড়ে আসা এই ব্যবসায়িক সহজলভ্যতা যেন শেষ পর্যন্ত আমাদের নিরাপত্তার প্রাচীর ধসিয়ে না দেয়।