মানসিক রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিতের দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে দাঁড়িয়েছেন এক তরুণ মুছা করিম রিপন। গুলশান এভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসার সামনে বুধবার (২৭ মে) দুপুরে এই তরুণকে প্ল্যাকার্ড হাতে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
মানসিক স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী রিপনের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘No Health Without Mental Health’। আরও লেখা ছিল- ‘দুলালীকে বাঁচাতে চাই। দুলালী কেন চিকিৎসা পাচ্ছে না- প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাব চাই।’
মানসিক স্বাস্থ্য অধিকারকর্মী রিপনের এই নীরব অবস্থানের কেন্দ্রে আছেন ‘দুলালী’ নামের এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারী।
রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭-এর জেনেটিক প্লাজার পাশের ফুটপাতে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছেন তিনি। এলোমেলো চুল, মলিন কাপড়, অসংলগ্ন কথাবার্তা- পথচারীদের কাছে হয়তো তিনি আরেকজন ‘পাগলি’।
কিন্তু রিপনের কাছে তিনি একজন মানুষ, একজন নাগরিক, যিনি চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রাখেন।
দুলালীর পাশে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। মুছা নিজ খরচে দুলালীর তিন বেলা খাবার দেন। নিজে পাশে থাকতে না পারলেও স্থানীয় বিসমিল্লাহ হোটেলের কর্মচারী মোহাম্মদ আবু ইউসুফ মুছার হয়ে প্রতিদিন তিন বেলা খাবার দেন তাকে। রিপন চিকিৎসার ব্যবস্থারও চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেই চেষ্টার পথ সহজ হয়নি।
রিপন জানান, সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে অন্তত আটটি হাসপাতালে ঘুরেও তিনি দুলালীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেননি। কোথাও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) চাওয়া হয়েছে, কোথাও অভিভাবক। অথচ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া একজন মানুষের পক্ষে এসব কাগজপত্র দেখানো প্রায় অসম্ভব।
এই হতাশা আর ক্ষোভ থেকেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। চিঠিতে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘দুলালী নামের এই ভদ্রমহিলাকে চিকিৎসা প্রদান করা কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়?’
তিনি আরও জানতে চেয়েছেন, সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন নিশ্চিত করার কথা এবং ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষার কথা বলা থাকলেও কেন একজন মানসিক রোগী চিকিৎসাবঞ্চিত থাকবেন।
রিপন বলেন, ‘রাষ্ট্র যখন জনগণের ট্যাক্সের টাকায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালনা করছে, তখন একজন সিজোফ্রেনিয়া রোগী শুধু এনআইডি কার্ড না থাকার কারণে চিকিৎসা পাবেন না, এটা কীভাবে গ্রহণযোগ্য?’
তিনি আরও বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য আইন-২০১৮ অনুযায়ী বিশেষ পরিস্থিতিতে অনিচ্ছুক রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে এনআইডি বা অভিভাবক বাধ্যতামূলক নয়। তবু বাস্তবে অনেক রোগীকেই ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
রিপনের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- অবিলম্বে দুলালীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, পরিচয়পত্র বা অভিভাবক না থাকলেও মানসিক রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনা এবং এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানো।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় হয়, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের তুলনায় অনেক কম।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে এখনও মানসিক রোগ নিয়ে সামাজিক ভয়, কুসংস্কার ও অবহেলা প্রবল। পরিবার হারানো কিংবা রাস্তায় পড়ে থাকা বহু মানুষ চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছেন।
আর সেই বাস্তবতার মাঝেই রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে গুলশানে দাঁড়িয়ে থাকা রিপনের প্ল্যাকার্ড যেন একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়- একজন মানসিক রোগী কি শুধুই পরিচয়হীন মানুষ, নাকি রাষ্ট্রেরও কোনো দায় আছে তার প্রতি?