বিশ্ব শরণার্থী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি মর্যাদা ও সম্মান নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে স্থানীয় সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়নের দাবি ওঠে।
শনিবার কক্সবাজারে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ে কক্সবাজার সিএসও এনজিও ফোরাম (সিসিএনএফ) ও কোস্ট ফাউন্ডেশন আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা এসব দাবি তুলে ধরেন।
সেমিনারে জানানো হয়, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ১৬ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। তবে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার তহবিল ক্রমাগত কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) বাস্তবায়নে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হলেও জুন পর্যন্ত পাওয়া গেছে মাত্র ৩৬৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার, যা মোট চাহিদার অর্ধেকেরও কম।
বক্তারা অভিযোগ করেন, স্থানীয় এনজিওগুলোকে জেআরপি ২০২৬ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া থেকে কার্যত বাদ দেওয়া হয়েছে। তারা বলেন, জাতিসংঘের ‘হিউম্যানিটারিয়ান রিসেট’ নীতিতে স্থানীয় নেতৃত্বাধীন মানবিক কার্যক্রম ও স্থানীয় সংস্থাগুলোর জন্য অধিক তহবিল বরাদ্দের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা প্রতিফলিত হয়নি। সম্প্রতি ইউএন ওসিএইচএ’র ১৫০ মিলিয়ন ডলারের তহবিলের ৯২ শতাংশ জাতিসংঘের সংস্থা এবং ৮ শতাংশ আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো পেয়েছে, যেখানে স্থানীয় সংগঠনগুলো সরাসরি কোনো অর্থায়ন পায়নি।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মো. ইকবাল উদ্দিন মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় জনগণের নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্থানীয় এনজিওর সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ এবং স্থানীয় সরকার, জেলা প্রশাসন ও আরআরআরসির অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক জেআরপি বাস্তবায়নের দাবি জানান।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রাখাইন রাজ্য থেকে কক্সবাজারে অভিবাসনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তিনি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষায় গভীর নলকূপের বিকল্প পানির উৎস অনুসন্ধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রোহিঙ্গা সমন্বয় প্ল্যাটফর্মের প্রধান ডেভিড বাগডেন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সফল করতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
ইউএনএইচসিআরের স্ট্র্যাটেজিক ওভারসাইট সার্ভিসের প্রধান মার্সেল গ্রোগান নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান জোরদারের আহ্বান জানান।
সেমিনারে বক্তারা কক্সবাজার ও টেকনাফ অঞ্চলে পরিবেশ পুনরুদ্ধার, নিরাপত্তা জোরদার, মাদক ও অস্ত্র পাচার প্রতিরোধ, স্থানীয় জনগণের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় এনজিওগুলোর বৃহত্তর সম্পৃক্ততার দাবি জানান।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, এনজিও কর্মী ও রাজনৈতিক নেতারা অংশ নেন। বক্তারা সর্বসম্মতিক্রমে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।