চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ত্রাস লাল্টু বাহিনীর নেতা চরমপন্থী নুরুজ্জামান লাল্টু আর নেই। ৭২ বছর বয়সে গত বৃহস্পতিবার তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের অপরাধ জগতের একটি দীর্ঘ ও কলঙ্কিত অধ্যায়ের অবসান ঘটল। রণাঙ্গনের অকুতোভয় একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নুরুজ্জামান লাল্টুকে গত বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্রামে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে।
মরহুমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় তার নিজ গ্রামের নিজ নামের ‘নান্টু স্টেডিয়ামে।’ দাফন অনুষ্ঠানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন আলমডাঙ্গা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ এস এম শাহনেওয়াজ মেহেদী। আলমডাঙ্গা থানা পুলিশের একটি দল রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।
বিউগলের করুণ সুর আর জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত কফিনে ফুল দিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
তার মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়লে কয়রাডাঙ্গা ও আশপাশের এলাকা থেকে হাজারো মানুষ প্রিয় এই ব্যক্তিকে শেষ বিদায় জানাতে ভিড় করেন।
নুরুজ্জামান লাল্টুর জীবন ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি এবং তার বড় ভাই মতিয়ার রহমান মন্টু সাহসিকতার সঙ্গে গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন। চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের বীরত্বগাথা আজও অনেকের মুখে মুখে ফেরে।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে নুরুজ্জামান লাল্টু নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (জনযুদ্ধ) আঞ্চলিক শীর্ষ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এক সময় তিনি ওই অঞ্চলে চরমপন্থী কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। এলাকার ত্রাস ছিল লাল্টু বাহিনী।
তিনি জাতীয় নেতা কাজী আরেফ আহমেদসহ পাঁচ জাসদ নেতা হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন। দীর্ঘ সময় আড়ালে থাকার পর জীবনের শেষ ভাগে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাপন শুরু করেন।
রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা বা অতীতের বিতর্ক সত্ত্বেও এলাকায় লাল্টু একজন সাহসী ও স্পষ্টভাষী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি ছিলেন অসম্ভব জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে তিনি কয়রাডাঙ্গায় নিজ বাড়িতে নিভৃত জীবন পার করছিলেন। সেখানেই মাথায় আঘাতজনিত কারণে তার মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে।
নুরুজ্জামান লাল্টুর মৃত্যুর পর অনেকেই তাকে নিয়ে ফেসবুকে নানা রকম লেখালেখি করেছেন। চুয়াডাঙ্গা জেলা গোয়েন্দা পুলিশে কর্মরত অফিসার এস আই রবিউল রাজ লিখেছেন, ‘‘চুয়াডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গার সেই ‘মুকুটহীন সম্রাট’ চরমপন্থী নেতা নুরুজ্জামান লাল্টুর বিদায়: এক রক্তাক্ত ইতিহাসের সমাপ্তি। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক সময়ের আতঙ্কের নাম চরমপন্থী নেতা নুরুজ্জামান লাল্টু আর নেই। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের অপরাধ জগতের একটি দীর্ঘ ও কলঙ্কিত অধ্যায়ের অবসান ঘটল।’’
এক জীবনে দুই রূপ
নুরুজ্জামান লাল্টুর জীবন ছিল চরম বৈপরীত্যে ভরা। একদিকে তিনি ছিলেন মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন যোদ্ধা, অন্যদিকে স্বাধীনতার পর জড়িয়ে পড়েন আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্ধকার জগতে। নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হিসেবে তিনি নব্বইয়ের দশকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।
ভয়াবহ সেই ইটভাটার স্মৃতি
আলমডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গার সেই পুরনো ইটভাটা আজও স্থানীয়দের মনে আতঙ্ক জাগায়। অভিযোগ আছে, লাল্টুর নির্দেশে বহু মানুষকে হাত-পা বেঁধে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে সেই চুলায়। নিখোঁজ হওয়া অনেক মানুষের দেহাবশেষ সেখানে পাওয়া গেছে বলে এলাকায় লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, যা তাকে এক নৃশংস ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত করেছিল।
আত্মসমর্পণ ও কারাজীবন
১৯৯৯ সালের ২৯ জুলাই তৎকালীন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি লুৎফুল কবীরের কাছে শতাধিক আগ্নেয়াস্ত্রসহ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন লাল্টু ও তার বাহিনী। দীর্ঘ ১৯ বছর কারাভোগের পর ২০১৮ সালে তিনি মুক্তি পান। মজার ব্যাপার হলো, আত্মসমর্পণের সময় তিনি নিজের এলাকার উন্নয়নের জন্য ১৫ দফা দাবি পেশ করেছিলেন, যার মধ্যে বিদ্যুৎ ও রাস্তাঘাটের দাবিও ছিল।