রোগীরাই তার স্বজন, হাসপাতালই তার সংসার। আর এই সংসারটাকে আগলে রাখতেই সুদূর লন্ডন থেকে বাংলাদেশে এসে থিতু হয়েছেন ব্রিটিশ নাগরিক জুলিয়ান মার্গারেট রোজ (জুলিয়ান এম রোজ)। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে মানবসেবার ব্রত নিয়ে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন মেহেরপুরের মানুষের জন্য। বয়স এখন ৮৬, তবুও ক্লান্তিহীন এই নারী প্রতিদিনই ছুটে যান অসহায় মানুষের সেবায়। দীর্ঘ এই সেবাময় জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার আকুতি একটাই, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব।
শৈশবে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা। যুদ্ধের ক্ষতবিক্ষত মানুষ আর তাদের অসহায়তা গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল তার মনকে। সেই সময় থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক অদম্য ইচ্ছা জন্ম নেয় তার ভেতরে। কৈশোরে খ্রিস্টান মিশনারিদের সঙ্গে তিনি ঘুরেছেন বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশালসহ বিভিন্ন জনপদে। সেখানকার দরিদ্র মানুষের জীবনসংগ্রাম তাকে আরও দৃঢ় করে মানবসেবার পথে।
দেশে ফিরে তিনি নার্সিং পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর ১৯৮১ সালে আবারও বাংলাদেশে ফিরে আসেন। তবে এবার আর ফিরে যাওয়ার জন্য নয়, বরং জীবনের বাকি সময়টা মানবতার সেবায় উৎসর্গ করার অঙ্গীকার নিয়ে।
১৯৯৬ সালে মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার বল্লভপুর মিশনারি হাসপাতালকে ঘিরে শুরু হয় তার নতুন পথচলা। তারপর থেকে এখানেই তিনি অসুস্থ ও দরিদ্র মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন নিরলসভাবে।
শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, হাসপাতালের পাশেই তিনি গড়ে তুলেছেন একটি বৃদ্ধাশ্রম। সেখানে আশ্রয় পেয়েছেন ২০ জন অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। তাদের দেখভাল, চিকিৎসা আর যত্ন, সবকিছুতেই তিনি নিজেই থাকেন অগ্রভাগে। স্থানীয় মানুষের কাছে তাই তিনি ‘মানবতার মা’ কিংবা ‘মাদার তেরেসা’ নামেই বেশি পরিচিত।
এই হাসপাতাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীরা এসে নার্সিং প্রশিক্ষণ নেয়। তার স্নেহ, শাসন ও দক্ষতায় তৈরি হচ্ছে নতুন প্রজন্মের সেবিকারা। সহকর্মী চিকিৎসক ও নার্সরা বলেন, এই মহীয়সী নারীর সঙ্গে কাজ করতে পারাটা তাদের জন্য এক বিরল সৌভাগ্য।
দীর্ঘদিন ধরে এদেশের মানুষের সেবা করলেও এখনও বাংলাদেশি নাগরিকত্ব পাননি জুলিয়ান মার্গারেট রোজ। ফলে ভিসার মেয়াদ বাড়াতে প্রায়ই তাকে প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। জীবনের শেষ সময়টা যে দেশে মানুষের সেবা দিয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন, সেই দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার আকুতিই এখন তার একমাত্র প্রত্যাশা।
২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মেহেরপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আব্দুস সালাম সিস্টার জুলিয়ান মার্গারেট রোজকে নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে চিঠি দেন।
এ বিষয়ে মুজিবনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল হুদার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা জানিয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে, মেহেরপুরের বর্তমান জেলা প্রশাসক ড. সৈয়দ এনামুল কবিরকে প্রতিবেদক নিজের পরিচয় দিয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
উল্লেখ্য, ১৯৩৯ সালে ব্রিটেনের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া জিলিয়ান মার্গারেট রোজ আজ নিজের জন্মভূমি থেকে হাজার মাইল দূরে দাঁড়িয়ে গড়ে তুলেছেন আরেকটি মানবিক ঠিকানা। জন্মভূমি ব্রিটেন হলেও হৃদয়ের ঠিকানা হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। আর জীবনের শেষ অধ্যায়েও তার একটাই স্বপ্ন, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এখানেই থেকে আমৃত্যু মানুষের সেবা করে যাওয়া।