মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় দেশের কৃষি খাতে ডিজেল সরবরাহেও চাপ পড়েছে। এর প্রভাব এখন মাঠে টের পাচ্ছেন কৃষকরা। মানিকগঞ্জে সেচের জন্য ডিজেল পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেক কৃষককে। অথচ বিকল্প জ্বালানি হিসেবে প্রায় এক যুগ আগে স্থাপন করা সৌরচালিত সেচ পাম্পগুলোর বেশিরভাগ এখন অচল। যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কোটি টাকার এসব প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছেন না কৃষকরা।
তথ্য বলছে, জেলায় প্রায় নয় হাজার বিদুৎ চালিত সেচ পাম্প রয়েছে। এসব পাম্পে প্রত্যেক বছর ৩৫ মেগাওয়াট বিদুৎ প্রয়োজন হয়। এছাড়াও ২১ হাজার দুইশো ২৩টি ডিজেল চালিত সেচ পাম্প রয়েছে। এসব পাস্পে প্রতিদিন প্রায় ৮৫ হাজার লিটার ডিজেল তেল প্রয়োজন হয়।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, সোলার পাম্প প্রকল্পগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা হলে সেচ কাজে সাম্প্রতিক ডিজেল সংকটে কোন প্রভাব পড়তো না৷ ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠা সোলার পাম্প সঠিকভাবে ব্যবহার হলেও সরকারি প্রকল্পগুলোতে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে, এখনো কৃষকরা বিদুৎ ও ডিজেল চালিত সেচের উপর নির্ভরশীল। গত কয়েকদিন ধরে ডিজেলের সংকট দেখা দেওয়ায় তাদের বাড়তি দামে সেচ পাম্পের জন্য তেল কিনতে হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারন কার্যালয় জানায়, জেলায় মোট সাতটি সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ পাম্প রয়েছে। এসব পাম্পের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমিতে সেচ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকটি পাম্প নিয়মিত সচল থাকলেও কিছু পাম্প আংশিক সচল বা অচল রয়েছে। মানিকগঞ্জ বিএডিসি’র সেচ তালিকা অনুযায়ী পাঁচটি পাম্প থাকলেও সবগুলো সচল নেই।
প্রায় ১০ বছর আগে সিংগাইর উপজেলার তালেবপুর ইউনিয়নের রসুলপুর এলাকায় কোরিয়ান সংস্থার সহযোগিতায় একটি সৌর বিদুৎ পাম্প স্থাপন করা হয়। ২৪টি সোলার প্যানেলের এই পাম্পের উৎপাদন ক্ষমতা ৫.১৬ কিলোওয়াট। প্রায় ৮ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও পাম্পটি বর্তমানে অচল রয়েছে।
ওই গ্রামের কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, ২০১৬ সালে সোলার পাম্প স্থাপনের পর এলাকায় বেশ আলোড়ন তৈরি হয়। কৃষকদের মাঝেও আগ্রহ সৃষ্টি হয়। প্রথম দুই/ তিন বছর পানি পাওয়ার পর সোলার চুরি হয়ে যায়। পরে একাধিকবার বিদ্যুৎ অফিস, বিএডিসি, কৃষি অফিসে জানালেও কোন সমাধান হয়নি। এখন সোলার পাম্প পুরোপুরি পরিত্যক্ত।
ওই উপজেলার জয়মন্টপ ইউনিয়নের রায় দক্ষিন এলাকার কৃষক ওহাব খান ব্যক্তিগত উদ্যোগে গত বছর সোলার পাম্প স্থাপন করেছেন। ১৫টি সোলারের পাম্পে ৮.৭৫ কিলোওয়াট ক্ষমতা রয়েছে যা দিয়ে ৩০ বিঘা জমি চাষ করা হয়।
ওহাব খান বলেন, গত বছর ব্যক্তিগতভাবে সোলার পাম্প বসিয়েছি। ডিজেল ও বিদুৎতের চেয়ে খরচ কম। যন্ত্রাংশে কোন সমস্যা হলে টেকনিশিয়ানরা এসে মেরামত করে দেয়। সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সোলার পাম্প আরও জনপ্রিয় হবে।
ওহাব খানের মতো ব্যক্তিগত পর্যায়ে জেলাতে আরো তিনটি সোলার পাম্প রয়েছে। তাদের ভাষ্য, প্রযুক্তি ও টেকনিক্যাল সমস্যা সমাধানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কৃষকরা আরও আগ্রহী হবে। এতে করে ডিজেল ও বিদুৎ চালিত সেচ পাম্পের ব্যবহার কমে যাবে। ফলে কৃষিতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বিদুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।
মানিকগঞ্জ কৃষি উন্নয়ন কমিটির সমন্বয়কারী নজরুল ইসলাম বলেন, এক যুগ আগে কোরিয়ান সংস্থার মাধ্যমে বিএডিসি ও পল্লী বিদুৎ সমিতির সহযোগিতায় জেলাতে চারটি সোলার পাম্প স্থাপন করা হয়। এসব সোলার পাম্প রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কৃষকের প্রত্যাশা পূরন করতে পারেনি৷ পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং কৃষকের ডিজেল ও বিদুৎ খরচ বাঁচাতে সোলার পাম্পের বিকল্প নেই।
মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া কৃষি প্রশিক্ষন ইন্সটিটিউটের অধ্যক্ষ এম এম এ সালাম বলেন, বিদুৎ চালিত সেচ পাম্পগুলো দ্রুত সৌরবিদুৎ পাম্পে রুপান্তর না হলে পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এছাড়া সোলার পাম্প ব্যবহারে কৃষকদের সহযোগিতা করা গেলে বিদুৎ খাতে ঘাটতি কমে যাবে। এসব সৌর সেচ পাম্পের মাধ্যমে ডিজেল নির্ভর সেচ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্য থাকলেও যান্ত্রিক ত্রুটি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত সুবিধা পাচ্ছেন না কৃষকরা।
মানিকগঞ্জ বিএডিসি’র ( সেচ) সহকারী প্রকৌশলী তিতাস বলেন, সেচ পাম্পগুলো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে দেওয়ার পর এক বছর প্রযুক্তিগত সেবা প্রদান করে। তারপর সোলার পাম্পের কোন যান্ত্রিক ত্রুটি থাকলে কৃষকদের নিজ উদ্যোগে ঠিক করতে হয়। এক্ষেত্রে বিএডিসি কৃষকদের সহযোগিতা করে। যেসকল পাম্প বন্ধ রয়েছে তা দ্রুত চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মানিকগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ বলেন, কৃষিতে জ্বালানি সাশ্রয় এবং পরিবেশবান্ধব সেচ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সৌরচালিত সেচ পাম্পের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এজন্য কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।