সাতক্ষীরা পৌর এলাকায় সুপেয় পানির সংকট এখন চরম সীমায় পৌঁছেছে। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে পৌরসভার সরবরাহ লাইনে পানি না থাকায় ৯টি ওয়ার্ডের বাসিন্দারা নিদারুণ কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। একদিকে যেমনি ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সাধারণ নলকূপগুলো অকেজো হয়ে পড়েছে, তেমনি অন্যদিকে পৌরসভার অধিকাংশ পাম্প বিকল হয়ে পড়ে থাকায় হাহাকার ছড়িয়ে পড়েছে শহরজুড়ে।
শহরের ইটাগাছা, কামলনগর, রসুলপুর ও মাস্টারপাড়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ভোরের আলো ফোটার আগেই নারীরা কলসি ও বালতি নিয়ে দূর-দূরান্তে ছুটছেন। কোথাও ব্যক্তিগত গভীর নলকূপ সচল থাকলে সেখানে দীর্ঘ লাইন পড়ছে। অনেকে নিরুপায় হয়ে চড়া দামে ভ্যান থেকে ড্রামভর্তি পানি কিনে প্রয়োজন মেটাচ্ছেন।
শহরের এক বাসিন্দা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘আমরা নিয়মিত পানির বিল দিই। কিন্তু কলের মুখ দিয়ে এক ফোঁটা পানিও বের হয় না। এখন প্রতি ড্রাম পানি ২০-৩০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। আমরা কি শুধু বিল দেওয়ার জন্যই নাগরিক?’
বিশেষ করে ১, ৩, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। কয়েক মাস ধরে এসব এলাকার বাসিন্দারা নিয়মিত পানি পাচ্ছেন না। ফলে গোসল, শৌচাগার ব্যবহারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ ব্যাহত হচ্ছে। তীব্র গরমে জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
কাটিয়া মাস্টারপাড়া এলাকার এক বাসিন্দা জানান, কয়েক মাস ধরে পানির জন্য চরম কষ্টে আছি। আগে মাঝে মাঝে পানি পাওয়া গেলেও এখন সেটাও বন্ধ।
সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা হালিমাতুজ সাদিয়া বলেন, ‘সারাদিন শুধু পানির চিন্তা করতে হয়। কলেও পানি নেই, টিউবওয়েলের পানিও ব্যবহারযোগ্য নয়।’
সাতক্ষীরা নাগরিক কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলী নূর খান বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে পুকুর ভরাট করে আবাসন নির্মাণ করায় সংকট আরও বেড়েছে। মানুষ এখন বাধ্য হয়ে অস্বাস্থ্যকর পানি ব্যবহার করছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি
তৈরি করছে।’
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, শহরে দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ লিটার। সেখানে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৬০ লাখ লিটার, যা চাহিদার অর্ধেকেরও কম। ১৮টি পাম্পের মধ্যে কয়েকটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল রয়েছে।
পৌরসভার পানি সরবরাহ শাখার দায়িত্বশীলরা জানান, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় উত্তোলন কমেছে। বিকল পাম্প মেরামত ও নতুন মোটর স্থাপনের
কাজ চলমান রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে একই সংকট দেখা দিলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। দ্রুত গভীর নলকূপ স্থাপন, পানি শোধনাগার চালু এবং জরুরি ভিত্তিতে ট্যাংকারের মাধ্যমে পানি সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, উপকূলীয় জেলা হওয়ায় লবণাক্ততা ও পানির স্তর নেমে যাওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে অবিলম্বে টেকসই পানি শোধনগার ও বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য সরকারি বড় বরাদ্দ প্রয়োজন। নয়তো এই সংকট আগামী গ্রীষ্মে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।