জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আর ঘনঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে থাকা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদে আশার আলো দেখাচ্ছে ‘সবুজ বেষ্টনী’। সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকায় সামাজিক সংস্থা ফ্রেন্ডশিপ-এর বিশেষ উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল ম্যানগ্রোভ নার্সারি ও বনায়ন প্রকল্প। স্থানীয় জনবল, বিশেষ করে নারীদের সম্পৃক্ত করে তৈরি এই বনভূমি এখন জলোচ্ছ্বাস ও বাঁধ ভাঙন রোধে কাজ করছে ‘প্রাকৃতিক দেয়াল’ হিসেবে।
এই ম্যানগ্রোভ নার্সারিতে উৎপাদিত হচ্ছে কেওড়া, কাঁকড়া, গেওয়া’র মত সুন্দরবনের উদ্ভিদ। এসব নার্সারী থেকে মানগ্রোভ প্রজাতির গাছের চারা ব্যাক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রোপন করা হচ্ছে উপকূলীয় এলাকায়। ফলে, গেল কয়েক বছরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলে বেড়েছে ম্যানগ্রোভ বনভূমি। এভাবে বনভূমি বেড়ে যাওয়ায়, আগের তুলনায় অনেকাংশে কমেছে নদী ভাঙন। গাছপালা বৃদ্ধির কারণে, সংস্থান হয়েছে গো-খাদ্যের। পরিবেশে এসেছে ভারসাম্য। ফলে, প্রচন্ড গরমেও এখানে আবহাওয়া থাকছে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক।
শ্যামনগর উপজেলা পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ঝাঁপা গ্রামের বাসিন্দা ঠাকুরাণী গাইন জানান, নদীর চরে সুন্দরবনের গাছপালা জন্মানোর কারণে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে ভাঙন কবলিত বেঁড়িবাধ।এর পাশাপাশি বেড়ি বাঁধ ঘেঁষে সৃষ্টি হয়েছে দৃষ্টিনন্দন মিনি সুন্দরবন।
একই ইউনিয়নের কোলা গ্রামের বাসিন্দা মারিয়াম খাতুন জানান, নদী তীরে বনভূমি থাকার কারণে, উঁচু জলোচ্ছাস থেকে রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে ফসলি জমি এবং মিষ্টি পানির পুকুরগুলো।
আশাশুনি উপজেলা প্রতাপনগর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালী জানান, ফ্রেন্ডশিপ-এর ম্যানগ্রোভ বনায়নের কারণে কর্মসংস্থান এবং আয়ের পথ তৈরি হয়েছে উপকূলের স্থানীয় বাসিন্দাদের। গাছপালার কারণে সংস্থান হচ্ছে গো-খাদ্যের। ফলে, পশুপালন এবং হাঁস-মুরগি পালনে নতুন করে আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছে উপকূলবাসী।
সাতক্ষীরার উপকূলীয় উপজেলার নদী তীরবর্তী এমন ব্যাতিক্রমী ম্যানগ্রোভ বনায়ন, স্থানীয় প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমি রাখতে শুরু করেছে, যা পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবিলায় স্থানীয়দের জন্য বড় ঢাল হিসেবে কাজ করছে বলে জানান স্থানীয় সংশ্লিষ্টরা।
ফ্রেন্ডশিপ-এর ম্যানগ্রোভ প্লানটেশান কর্মসূচির জেষ্ঠ টেকনিক্যাল মানেজার মাইদুল ইসলাম জানান, দক্ষিণাঞ্চলের সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার চারটি উপজেলার নদী তীরবর্তীতে ফ্রেন্ডশিপ নার্সারির মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে বনায়ন কর্মসুচি। বর্তমানে ১৬টি নার্সারি থেকে উৎপাদিত হচ্ছে ১৬ লাখ চারা। আর এই চারাগুলো রোপন করা হচ্ছে ফ্রেন্ডশিপ বনায়ন কর্মসূচিতে। কয়েকটি এলাকা
মিলে মোট ৩০৫ হেক্টর জায়গায় রোপন করা হয়েছে ৯ লাখ ২১ হাজার বিভিন্ন প্রজাতির ম্যানগ্রোভ চারা। এর ফলে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে প্রায় ৮১ কিলোমিটার বেঁড়িবাধ।
পাশাপাশি, বনায়ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে নারীদের কর্মস্থানের। সেখানে তারা আবাদ করছে বিভিন্ন ধরণের শাক-সবজি এবং দেশি ফলের। এর সঙ্গে হাঁস-মুরগী, পশুপালনে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়ে উঠছেন তারা। ২০৩০ সাল নাগাদ, প্রায় এক হাজার হেক্টর জমিতে এমন বনায়ন কর্মসুচি বাস্তবায়নের কথাও জানান তিনি।