এক সময় দস্যুতা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তারা। কিন্তু পুনর্বাসনের অভাব, দীর্ঘসূত্রতা আর মামলার চাপে আবারও অনেকেই পা বাড়াচ্ছেন অন্ধকার জগতে। এমনই বাস্তবতা এখন উপকূলীয় অঞ্চলজুড়ে, বিশেষ করে সুন্দরবন ঘিরে।
বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার শ্রীফলতলা এলাকার পঞ্চাশোর্ধ্ব সাব্বির শেখ। জীবনের ১৬টি বছর সুন্দরবনে দস্যুতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার। তাই ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণ করেন।
সাব্বির শেখ বলেন, ‘সুন্দরবনে টাকা ছিল, কিন্তু শান্তি ছিল না। এখন শান্তি আছে, কিন্তু পেটে ভাত নেই। মামলার খরচ চালাতে গিয়ে পৈতৃক সম্পত্তিও বিক্রি করতে হচ্ছে।’
একসময় জুলফিকার বাহিনীর নেতৃত্বে থাকা সাব্বির শেখ অভিযোগ করে জানান, আত্মসমর্পণের সময় মামলা প্রত্যাহার ও পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা পূরণ হয়নি। এখনও তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলমান। পরিবার নিয়ে ঠিক মতো তিন বেলা খেতে পারেন না। তার মতো অনেকেই এই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আবার সুন্দরবনে ফিরে যাচ্ছে যোগ করেন তিনি।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। এ সময় তারা ৪৬২টি অস্ত্র ও ২২ হাজার ৫৯৩ রাউন্ড গুলিসহ আত্মসমর্পণ করেন। পরে সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করে।
তবে বাস্তব চিত্র এখন ভিন্ন। আত্মসমর্পণকারীদের একাংশ আবারও দস্যুতায় জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
আত্মসমর্পণকারী সফিকুল শিকারী বলেন, ‘মামলার হাজিরা দিতে দিতেই জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। সরকার বলেছিল তিন মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করবে, কিন্তু অনেকেরই তা হয়নি। মামলার খরচ চালাতে গিয়ে আমরা চরম কষ্টে আছি।’
একই সুর আত্মসমর্পণকারী মো. সোলাইমানের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, ‘দৈনিক ৫০০-১০০০ টাকা আয় করে মাসে ৩০-৪০ হাজার টাকার মামলা চালানো সম্ভব না। বাধ্য হয়েই কেউ কেউ আবার সুন্দরবনে যাচ্ছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সাবেক দস্যু জানান, একটি মামলা থেকে বাঁচতে গিয়ে এখন তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। সরকারের সহযোগিতা ছাড়া বাঁচার উপায় নেই, বলেন তিনি।
কোস্ট গার্ড সূত্রে জানা যায়, গত দেড় বছরে বিভিন্ন অভিযানে করিম-শরীফ, নানা ভাই, ছোট সুমন, আলিফ ও আসাবুর বাহিনীসহ বিভিন্ন দলের ৬১ সদস্যকে আটক করা হয়েছে। এ সময় ৮০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৯৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয় এবং ৭৮ জন জেলে ও ৩ জন পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় বনদস্যুদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’-এর মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান চলছে। সুন্দরবন পুরোপুরি দস্যুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।”
অন্যদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেছেন, একজন অপরাধ করে বারবার সুযোগ পাবে এটা হতে পারে না। যারা দস্যুতায় জড়িত, তাদের হয় আত্মসমর্পণ করতে হবে, না হয় আইনের মুখোমুখি হতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মসমর্পণকারী দস্যুদের টেকসই পুনর্বাসন, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না করলে সুন্দরবনে দস্যুতার পুনরুত্থান ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।