টাকা ফেরতের নাটক, অতঃপর রেললাইনে হত্যা
পাওনা ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে ডেকে নেওয়া হয়েছিল ব্যবসায়ী আতিকুল ইসলামকে। টাকা ফেরতও দেওয়া হয়েছিল ঠিকঠাক। কিন্তু আতিকুল জানতেন না, এই টাকা কোনো সততা কিংবা সজ্জনতার প্রতীক ছিল না; এটি ছিল ওত পেতে থাকা একদল নরপিশাচের পাতা নিখুঁত ‘মরণফাঁদ’। টাকা হাতে পাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়ে তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে পেট, বুক ও ঘাড় কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় আতিকুলকে।
২০২৩ সালের নভেম্বরের সেই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ আড়াই বছর পর, তথ্য-প্রযুক্তির নিখুঁত জাদুবলে অবশেষে এই ক্লুলেস মার্ডারের অন্ধকার রহস্যের জট খুলেছে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিআইবি)। এই মেগা কিলিং মিশনের মূলহোতাসহ ইতিমধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে দুইজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
ঘটনার শুরু ২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জ রেললাইন সংলগ্ন একটি মাছের খামারের পুকুরে একটি ক্ষতবিক্ষত মরদেহ ভাসতে দেখে পুলিশে খবর দেন স্থানীয়রা। পরে শনাক্ত হয়, মরদেহটি নিখোঁজ ব্যবসায়ী আতিকুল ইসলামের। আতিকুলের বুক, পেট আর ঘাড়ের গভীর ক্ষতগুলোই বলে দিচ্ছিল, কতটা আক্রোশ আর নৃশংসতার সাথে খুন করা হয়েছে তাকে।
এই ঘটনায় নিহতের চাচা জসীমউদ্দিন বাদী হয়ে ফতুল্লা থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন। থানা পুলিশ দীর্ঘদিন এই হত্যাকাণ্ডের কূলকিনারা করতে না পারায়, অবশেষে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় পিবিআইয়ের ওপর। পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ মাহাবুবুর রহমান দায়িত্ব নিয়েই নামেন ছায়া তদন্তে।
পিবিআইয়ের তদন্ত ও আসামিদের স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বরের সেই কালরাতের রোমহর্ষক বিবরণ।
প্রথমে আলী সম্রাট নামের এক ব্যক্তি ব্যবসায়ী আতিকুলকে ফোন করে জানান, তার পাওনা ৫০ হাজার টাকা তিনি ফেরত দিতে চান। টাকা নেওয়ার জন্য আতিকুলকে আলীগঞ্জ রেললাইনের নির্জন অন্ধকারে ডেকে নেওয়া হয়। আতিকুল সেখানে পৌঁছালে আলী সম্রাট তার হাতে ৫০ হাজার টাকা তুলে দেয়। কিন্তু এটি ছিল স্রেফ আতিকুলকে আটকে রাখার এবং তার নজর ঘোরানোর নাটক।
আতিকুল টাকা পকেটে পুরতেই অন্ধকার থেকে রামদা ও ছুরি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওত পেতে থাকা শান্ত, আহাদসহ একদল ছিনতাইকারী। তারা আতিকুলের কাছ থেকে ফেরত পাওয়া ৫০ হাজার টাকাসহ তার কাছে থাকা বাকি সব অর্থ ছিনিয়ে নেয়। আতিকুল বাধা দিতে গেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার পেট, বুক ও ঘাড়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে তারা। রক্তাক্ত আতিকুল নিথর হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে, অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলতে এবং মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে পাশেই মাছের খামারের পুকুরের পানিতে ছুড়ে ফেলে দ্রুত পালিয়ে যায় খুনিরা।
দীর্ঘদিন কোনো ক্লু না থাকলেও পিবিআই তথ্য-প্রযুক্তির কল ডিটেইলস রেকর্ড ও নিবিড় গোয়েন্দা তথ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করে। শেষে গত ১৩ মে আলীগঞ্জ বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা শান্ত হোসেনকে গ্রেপ্তার করে তদন্ত কর্মকর্তা। শান্তর দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরের দিন ১৪ মে রাতে ফতুল্লা ও তার আশপাশের এলাকায় অভিযান চালায় পিবিআই। একে একে ধরা পড়ে আরও পাঁচ কিলার-আহাদ আলী, রুবেল, আশিক, জুম্মন এবং জাহিদ হাসান শুভ।
পুলিশ রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের পর গত ১৭ মে আসামিদের আদালতে তোলা হলে মূল কিলার শান্ত হোসেন এবং আহাদ আলী নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দেয়। টাকার লোভেই যে তারা এই সুসংগঠিত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে- তা এখন আদালতের নথিতে লিপিবদ্ধ।
পিবিআই জানিয়েছে, এই চক্রের সাথে আরও কারা জড়িত এবং আলী সম্রাটের মূল মোটিভ কী ছিল, তা পুরোপুরি উন্মোচনে তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।