প্রথম শ্রেণীর পৌরসভার তকমা থাকলেও বাস্তবে নাগরিক সুবিধার দিক থেকে চরম অবহেলা ও উন্নয়নবঞ্চনার শিকার মাগুরা পৌরসভা। বছরের পর বছর কর ও ভ্যাট আদায় করা হলেও সেই অনুপাতে উন্নয়নের কোনো দৃশ্যমান প্রতিফলন নেই বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের। ভাঙাচোরা সড়ক, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা, অন্ধকারে ডুবে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এবং অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনায় ক্ষোভে ফুঁসছে পৌরবাসী।
শহরের প্রাণকেন্দ্র ভায়নার মোড় থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও আবাসিক এলাকায় সন্ধ্যা নামলেই নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভায়নার মোড় থেকে যশোর রোড ভিটাশাইর পর্যন্ত পৌরসভার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সড়কবাতির ব্যবস্থা নেই, ফলে পুরো এলাকা রাতের বেলায় অন্ধকারে ডুবে থাকে।
এতে পথচারী ও যানবাহনের জন্য তৈরি হচ্ছে চরম ঝুঁকি। ঢাকা-ঝিনাইদহ মহাসড়কের সংযোগ সড়কসহ শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে মানুষকে। দুর্ঘটনা, ছিনতাই ও নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা দিন দিন বাড়লেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, পৌরসভার অধিকাংশ সড়কই এখন খানাখন্দে ভরা। কোথাও বড় বড় গর্ত, কোথাও ভাঙা ইট ও খোয়ার স্তূপ। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়ক পরিণত হয় জলাবদ্ধতার অভিশাপে। উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকায় দিনের পর দিন জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নেয়। এতে দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন শিশু, শিক্ষার্থী, নারী, বৃদ্ধসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ।
কলেজপাড়া, আদর্শপাড়া, স্টুডিওপাড়া, ভায়না টিটিসিপাড়া, নিজনান্দুলীয়া, পারনান্দুলীয়া, সাতদোহা, সীতারামপুর, কুকনা, পুলিশ লাইন, পাথরা, দোয়ারপাড়া, বাঁশতলা হাজীরোড় ও নতুন বাজারসহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে একই চিত্র দেখা গেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সমস্যাগুলো বিদ্যমান থাকলেও স্থায়ী সমাধানে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
নিজনান্দুলীয়া এলাকার বাসিন্দা খাদিজা খাতুন বলেন, ‘সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। রাস্তায় পর্যাপ্ত বাতি নেই। নারী ও শিশুদের নিয়ে চলাফেরা করতে আতঙ্ক কাজ করে। বারবার অভিযোগ করেও কোনো সুফল পাইনি।’
স্থানীয় বাসিন্দা রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘রাস্তাঘাটের অবস্থা এতোটাই খারাপ যে সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটুসমান পানি জমে যায়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় পানি নামার কোনো পথ নেই বা ভোগান্তির শেষ নেই।’
পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আক্কার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রতিবছর নিয়ম করে কর ও ভ্যাট দিচ্ছি। কিন্তু নাগরিক সুবিধার নামে আমরা পাচ্ছি শুধু অবহেলা। রাস্তাঘাটের এমন বেহাল অবস্থা যে চলাচলই কষ্টকর হয়ে পড়েছে।’
ইজিবাইকচালক শফিকুল বলেন, ‘ভাঙাচোরা সড়কে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। অনেক সময় যাত্রীসহ গাড়ি উল্টে যাওয়ার উপক্রম হয়। দুর্ঘটনার আশঙ্কা সবসময়ই থাকে।’
আরেক ইজিবাইকচালক বলেন, ‘শহরের প্রধান সড়কেই যদি পর্যাপ্ত আলো না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ নিরাপদে চলাচল করবে কীভাবে? অন্ধকারের সুযোগে ছিনতাইসহ নানা অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে।’
শুধু সড়ক বা ড্রেনেজ নয়, শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপও নাগরিক দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলেছে। অনেক স্থানে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব চোখে পড়েছে। ফলে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যও হুমকির মুখে পড়ছে।
পৌরবাসীর অভিযোগ, প্রথম শ্রেণীর পৌরসভার মর্যাদা থাকলেও উন্নয়নের সূচকে মাগুরা এখনো অনেক পিছিয়ে। নাগরিক সুবিধার ক্ষেত্রে জেলার মানুষ নিজেদের বৈষম্যের শিকার বলে মনে করছেন। তাদের প্রশ্ন-কর আদায় অব্যাহত থাকলেও নাগরিক সেবার মান কেন উন্নত হচ্ছে না? কেন বছরের পর বছর একই সমস্যার মধ্যে বসবাস করতে হবে?
এ বিষয়ে মাগুরা পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান বারী বলেন, ‘মাগুরা পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রায় ৫২২ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৫ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে বাজেট অনুমোদন ও বরাদ্দের প্রক্রিয়া চলমান। অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে পৌরসভার সার্বিক উন্নয়নে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ শুরু করা হবে।’
মাগুরাবাসীর দাবি, অবিলম্বে শহরের ভাঙাচোরা সড়ক সংস্কার, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ, পর্যাপ্ত সড়কবাতি স্থাপন, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিচ্ছন্ন নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হোক। অন্যথায় প্রথম শ্রেণীর পৌরসভার পরিচয় কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।