শ্রমিকের কাজ করে স্ত্রী রুশিয়া খাতুন ও পাঁচ বছর বয়সী ছেলে জাহাঙ্গীর আলমকে নিয়ে চলছিল জাবেদ আলীর সংসার। ১৯৮৮ সালে হঠাৎ তিনি নিখোঁজ হন। পরিবারের সদস্যরা তাকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও কোনো সন্ধান পাননি। এক পর্যায়ে স্বজনরা ধরে নেন হয়তো জবেদ আলি মারা গেছেন। পরে তারা খোঁজাখুঁজি বন্ধ করে দেন।
সম্প্রতি ৩৮ বছর পর হঠাৎ নিজ বাড়িতে ফিরেছেন জবেদ আলি। যুবক বয়সে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া জবেদ আলি এখন বার্ধক্যে পৌঁছেছেন। তাকে পেয়ে অন্য স্বজনেরা খুশি হলেও স্বাভাভিকভাবে নিতে পারছেন না স্ত্রী রুশিয়া খাতুন। মান ভাঙেনি তার। অভিমানে বন্ধ করে দিয়েছেন জবেদ আলির ঘরের ফেরার পথও। দিশা না পেয়ে জবেদ আলি অবস্থান নেন তার ভাইয়ের ঘরে।
ঘটনাটি ঘটেছে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বামন্দী বাজারের ক্যম্প পাড়া এলাকার।
স্থানীয়রা জানান, ৩৮ বছর আগে যখন জাবেল আলী স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে তার বাড়িতে ছিল। অল্প আয় হলেও তাদের ছোট্ট পরিবারটি বেশ খুশিতে জীবনযাপন করছিল। কিন্তু হঠাৎ জাবেল আলী নিখোঁজ হওয়ায় চরম বিপাকে পড়তে হয়েছিল রুশিয়া খাতুনকে। ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে কোথায় যাবেন, কী করবেন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। অনেকে তাকে অন্যত্র বিয়ে করতে বললেও সন্তানের কথা চিন্তা করে তিনি রাজি হননি। অন্যের বাড়িতে কাজ করে ছেলেকে বড় করেছেন। এখন তার ছেলে কুয়েত প্রবাসী।
স্থানীয়রা আরও জানান, এত বছর পর জাবেদ আলী নিজ বাড়িতে ফিরেছেন। তিনি নাকি এতদিন মানিকগঞ্জে ছিলেন। সেখানে বিয়ে করছেন। একটি মেয়েও রয়েছে।
এদিকে স্বামীকে দেখে মোটেও খুশি হতে পারেননি রুশিয়া খাতুন। নিজেদের ছোট্ট সুন্দর সুখের সংসার ফেলে অন্য জায়গায় সংসার পেতেছেন। এখন সেই স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আগের স্ত্রীর কাছে ফিরে এসেছেন বিষয়টি কোনোভাবেই মানতে পারছেন না রুশিয়া খাতুন।
রুশিয়া খাতুনের অভিযোগ, জবেদ আলী দ্বিতীয় বিয়ে করে স্ত্রী ও সন্তানকে কার্যত অসহায় অবস্থায় ফেলে যান। এ কারণে রুশিয়া একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন। কিন্তু সেখানে আর্থিক সংকট দেখা দিলে শুরু হয় কঠিন সংগ্রাম।
রুশিয়া খাতুন বলেন, ‘ওই সময় তাকে সব জায়গায় খুঁজেও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। বুকের সন্তানকে নিয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছি। মানুষের বাড়িতে এমন কোনো কাজ নেই, যা করিনি। সন্তানকে বড় করতে জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছি।’
তিনি জানান, পরে ছেলে বড় হয়ে কৃষিশ্রমিকের কাজ শুরু করে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নেয়। বর্তমানে জাহাঙ্গীর কুয়েতপ্রবাসী। তার আয়ে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরে এসেছে।
স্বামীকে মেনে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রুশিয়া খাতুন বলেন, ‘তার ফিরে আসা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। ৩৮ বছর সন্তান নিয়ে অথৈ সাগরে ভেসেছি। তখন কি একবারও তার মনে হয়েছে, ঘরে থাকা নিষ্পাপ শিশুটি কী খাচ্ছে, কীভাবে বেঁচে আছে? যে সময়ে একজন স্ত্রীর জন্য স্বামীই ছিল বেঁচে থাকার অবলম্বন, সেই সময় তাকে পাশে পাইনি। এখন সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে, তাই সে এসেছে? ছেলে বিদেশ থেকে ফিরে এলে তার মতামত অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
জবেদ আলীর ভাই ও ভাতিজারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ থাকার কারণে তারা ধরে নিয়েছিলেন, জবেদ আলী আর বেঁচে নেই। পরে তার খোঁজাখুঁজি বন্ধ করে দেন। তবে তারা আশা করছেন, পারিবারিক আলোচনার মাধ্যমে জবেদ আলীর স্ত্রী ও ছেলে তাকে মেনে নেবেন।
তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের দূরত্ব ও অভিমান একসময় কেটে যাবে এবং পরিবারটি আবার একসঙ্গে বসবাস করতে পারবে।
জবেদ আলী জানান, মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার কুন্ডুরিয়া গ্রামে তিনি আরেকটি সংসার গড়েছিলেন। সেখানে তার একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তবে ওই স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পরিবার ও স্বজনরা যদি আমাকে মেনে নেয়, তাহলে মেয়েকেও এখানে নিয়ে আসব।’ কী কারণে তিনি বাড়ি ছেড়েছিলেন, জানতে চাইলে জবেদ আলি তা সাংসারিক ও ব্যক্তিগত বিষয় উল্লেখ করে এড়িয়ে যান।