কক্সবাজারের টেকনাফে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বন্যহাতির চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ করিডোরের মধ্যে প্রায় ৫ মিটার উঁচু ও ১৩৭ মিটার দীর্ঘ একটি ইটের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। বনাঞ্চলের ভেতরে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের ফলে হাতির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফের ২৬ নম্বর শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পেছনে সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরে প্রায় দুই মাস ধরে নির্মাণকাজ চলছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) অর্থায়নে একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র (ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ফ্যাসিলিটি) স্থাপনের অংশ হিসেবে এই সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের কারণে গাছপালা অপসারণ করা হচ্ছে এবং বনের স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বন্যহাতি, বানর, শিয়াল, বনবিড়াল, সরীসৃপ ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থলের ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শালবাগান বনাঞ্চল উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। দীর্ঘদিন ধরে এটি এশীয় বন্যহাতির স্বীকৃত চলাচলের পথ বা ‘এলিফ্যান্ট করিডোর’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফলে করিডোরের মধ্যে উঁচু সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হলে হাতির চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি মানুষ-হাতি সংঘাতও বেড়ে যেতে পারে।
পরিবেশ বিষয়ক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’ কক্সবাজারের যুগ্ম আহ্বায়ক এইচ এম ফরিদুল আলম শাহীন বলেন, শালবাগান বন শুধু হাতির আবাসস্থল নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতির করিডোর। এখানে স্থায়ী সীমানা প্রাচীর নির্মাণের ফলে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি আরও বলেন, হাতির চলাচলের পথ সংকুচিত হলে তারা বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হবে। এতে লোকালয়ে হাতির প্রবেশ এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বাড়তে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ হাসান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের কারণে এ অঞ্চলের পাহাড়, বনভূমি ও কৃষিজমি ইতোমধ্যে ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে। এখন সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে পরিবেশের ওপর আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ও স্থানীয় মহল বলছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) করা প্রয়োজন ছিল। তারা দ্রুত নির্মাণকাজ স্থগিত করে প্রকল্পের অবস্থান পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি সংরক্ষিত বনভূমি, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও হাতির করিডোর সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় পরিবেশ সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, সংরক্ষিত বনভূমির মধ্যে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের জন্য বন অধিদপ্তরের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ‘ইউএনডিপির অর্থায়নে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু বন বিভাগ এ ধরনের নির্মাণকাজের অনুমোদন দেয়নি। আমরা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ে লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছি এবং কাজ বন্ধ রাখার অনুরোধ করেছি। তবুও নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে।’
ডিএফও বলেন, এলাকাটি বন্যহাতিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে স্থায়ী সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হলে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ, আবাসস্থল ও বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে পরিবেশ দূষণ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ আদর্শ সমাধান নয়। একই সঙ্গে বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।