শরীয়তপুরের নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলার পদ্মা নদীবেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকার দুটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করেছিল। কিন্তু চালক সংকট, জ্বালানি বরাদ্দের অভাব ও দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অবহেলায় আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামসমৃদ্ধ নৌযান দুটি কখনোই মানুষের সেবায় কাজে লাগেনি। বর্তমানে একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স নদীতে ডুবে বিকল হয়ে পড়ে আছে, আর অন্যটির কোনো খোঁজ মিলছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নড়িয়া ও জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি করে নৌ-অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করে। উদ্দেশ্য ছিল পদ্মা নদীর দুর্গম চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের দ্রুত জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু চালক নিয়োগ না হওয়া, জ্বালানির জন্য কোনো বরাদ্দ না থাকা এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শুরু থেকেই নৌ-অ্যাম্বুলেন্স দুটি অকেজো হয়ে পড়ে।
নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের এই চরম অব্যবস্থাপনার খেসারত দিচ্ছেন চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের দাবি, কুন্ডেরচর ইউনিয়নে গত দেড় বছরে হাসপাতালে সময়মতো পৌঁছাতে না পারায় শাহিদা আক্তার, মিতু আক্তার ও নুরুন্নাহার নামে তিন অন্তঃসত্ত্বা নারীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের অভিযোগ, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স সচল থাকলে হয়তো এসব প্রাণহানি এড়ানো যেত।
স্থানীয়রা বলেন, সরকারের লাখ লাখ টাকার সম্পদ বছরের পর বছর অযত্নে নষ্ট হলেও কারও কোনো জবাবদিহি নেই। একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স নদীতে ডুবে আছে, আরেকটি হারিয়ে গেছে এটি শুধু অবহেলার নয়, দায়িত্বহীনতারও বড় উদাহরণ। তারা দ্রুত দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং চরাঞ্চলের মানুষের স্বার্থে নৌ-অ্যাম্বুলেন্স দুটি সচল বা বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
জানা গেছে, নড়িয়া উপজেলার চরআত্রা, নওপাড়া ও ঘড়িসার এবং জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা, পালেরচর ও কুন্ডেরচর ইউনিয়নের বাসিন্দারা যাতায়াতের জন্য প্রায় পুরোপুরি নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। জরুরি রোগী, প্রসূতি কিংবা দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নিতে তাদের একমাত্র ভরসা ট্রলার বা ছোট নৌকা। অথচ সরকারি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স থাকার পরও তারা কখনো এ সেবার সুফল পাননি।
নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহ জালাল বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই নৌ-অ্যাম্বুলেন্সটি অচল অবস্থায় ছিল। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় এটি নদীতে নিমজ্জিত হয়ে বিকল হয়ে গেছে।’
অন্যদিকে জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নৌ-অ্যাম্বুলেন্সটি হাসপাতাল থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের মঙ্গলমাঝি-সাত্তার মাদবর ঘাটে রাখা হয়েছিল। বর্তমানে সেটির কোনো হদিস নেই।
এ বিষয়ে জাজিরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রোমান বাদশা বলেন, ‘নৌযানটি হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। বিষয়টি তদন্তেরও অনুরোধ করা হয়েছে।’
শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন বলেন, ‘জেলায় দুটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে, বিষয়টি আমি জানি। বর্তমান অবস্থা খতিয়ে দেখে নৌযানগুলোর অবস্থান নিশ্চিত করা হবে। অচল নৌ-অ্যাম্বুলেন্সগুলো সচল করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’