নদীমাতৃক জনপদ শরীয়তপুরে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসারে নদীপথের ব্যবহার কমে গেলেও হারিয়ে যায়নি শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বুড়িরহাটের নৌকার হাট। বর্ষা মৌসুম এলেই প্রতি মঙ্গলবার ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত সদর উপজেলার বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে বসে কাঠের নৌকার এই ব্যতিক্রমী হাট। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নৌকা নির্মাতা, বিক্রেতা ও ক্রেতাদের উপস্থিতিতে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে পুরো এলাকা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ শতকের শুরুতে কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে বুড়িরহাট বাজারের যাত্রা শুরু হয়। পরে বর্ষা মৌসুমে স্থানীয় কাঠমিস্ত্রিরা এখানে কাঠের নৌকা বিক্রি শুরু করলে ধীরে ধীরে এটি ‘নৌকার হাট’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সময়ের পরিবর্তন সত্ত্বেও সেই ঐতিহ্য আজও অটুট রয়েছে।
প্রতি বছর মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতি মঙ্গলবার ভোর ৫টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বসে এই হাট। প্রতিবার গড়ে ৪০ থেকে ৫০টি নতুন ও পুরোনো কাঠের নৌকা বিক্রি হয়। নতুন নৌকার দাম ৮ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং পুরোনো নৌকার দাম ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে।
শরীয়তপুর-চাঁদপুর-চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে অবস্থিত বুড়িরহাট বাজার বর্তমানে জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানে দুই শতাধিক স্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রয়েছে উচ্চবিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কলেজ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, পুলিশ ফাঁড়ি, মসজিদ ও মন্দির।
বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সম্ভুনাথ পোদ্দার জানান, ১৯৪৬ সালে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিদ্যালয় মাঠে নৌকার হাট বসছে। তবে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও অন্তত চার দশক আগে এই হাটের প্রচলন ছিল। তিনি বলেন, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নৌকার ক্রেতা বা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের খাজনা আদায় করে না।
সদর উপজেলার পাটানিগাঁও, চন্দনকর ও রুদ্রকর, ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও, সাজানপুর ও পাপরাইল এবং ডামুড্যা উপজেলার ইসলামপুর ও ধানকাঠি এলাকার কারিগররা মূলত এই হাটের জন্য নৌকা তৈরি করেন। তাদের ভাষ্য, বর্ষা মৌসুমে কাঠমিস্ত্রির অন্যান্য কাজ কমে যাওয়ায় এ সময় বাড়িতেই নৌকা তৈরি করেন তারা। তবে লাভ কমে যাওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।
পৈতকাটি গ্রামের ৭৫ বছর বয়সী নৌকা নির্মাতা শংকর বালা বলেন, ‘বাপ-দাদারাও এই হাটে নৌকা বিক্রি করতেন। আমি নিজেও ৫৫ বছর ধরে এখানে নৌকা বিক্রি করছি। প্রতিবছর এপ্রিল মাসে নৌকা তৈরি শুরু করি, আর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিক্রি চলে। বছরের বাকি সময় কাঠমিস্ত্রির কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করি।’
ডামুড্যা উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের কৃষক আকবর কবিরাজ বলেন, ‘বর্ষাকালে চারদিকে পানি থাকায় চলাচল ও কৃষিকাজে নৌকার বিকল্প নেই। ছোটবেলা থেকে বাবার সঙ্গে এই হাটে আসতাম। এখনো পুরোনো নৌকা বিক্রি করে নতুন নৌকা কিনতে এখানেই আসি।’
স্থানীয়দের মতে, সময়ের সঙ্গে অনেক গ্রামীণ ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও বুড়িরহাটের নৌকার হাট এখনো নদীকেন্দ্রিক জীবন-সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং অসংখ্য মানুষের জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তাই শতবর্ষ পেরিয়েও এই হাট আজও ধরে রেখেছে তার স্বকীয়তা, প্রাণচাঞ্চল্য ও ঐতিহ্যের গৌরব।