বারবার বন্ধ ও চালুর টানাপোড়েনে দীর্ঘদিন ধরে থমকে আছে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী জাতীয় জুট মিলের চাকা। একসময় এই পাটকলকে ঘিরে সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার মানুষের। দীর্ঘদিন মিলটি বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অনেক শ্রমিক। তবে এবার বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় মিলটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়ায় নতুন করে আশার আলো দেখছেন শ্রমিক ও স্থানীয়রা।
সিরাজগঞ্জের রায়পুরে ৭৫ একর জমির ওপর ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় নর্দান পিপলস জুট মিল। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ করা হলে এর নাম দেওয়া হয় কওমি জুট মিল। পরে এটি জাতীয় জুট মিল নামে পরিচিতি লাভ করে।
একসময় জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে পাট সংগ্রহ করে এই মিলে নানা ধরনের পাটজাত পণ্য উৎপাদন করা হতো। দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এসব পণ্য রপ্তানি করা হতো বিদেশের বাজারেও। মিলটিকে কেন্দ্র করে সরাসরি প্রায় ৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল। পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী, পাটচাষি ও পরিবহন শ্রমিকরাও নানাভাবে উপকৃত হতেন।
তবে নানা অনিয়ম, ব্যবস্থাপনার জটিলতা, ঋণের বোঝা ও পাট সংকটসহ বিভিন্ন কারণে লোকসানে পড়ে মিলটি। ২০০৭ সালে বন্ধ হয়ে যায় উৎপাদন। পরে শ্রমিকদের আন্দোলন-সংগ্রামের মুখে ২০১১ সালে আবারও চালু করা হয় মিলটি। কিন্তু ২০১৯ সালে ফের বন্ধ হয়ে যায় এর কার্যক্রম।
এরপর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ২০ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হলে সীমিত পরিসরে উৎপাদন শুরু হয়। তবে এক বছরের মধ্যেই আবারও বন্ধ হয়ে যায় মিলটি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে বিশাল এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
দীর্ঘ অচলাবস্থার পর এবার মিলটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দেশের আরও দুটি পাটকলের সঙ্গে সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এই পাটকলটি ইজারা নিয়েছে দেশের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী প্রাণ-আরএফএল।
এর ফলে বন্ধ থাকা মিলটি আবারও উৎপাদনে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মিলটি চালু হলে প্রায় ৫ হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে পাট সরবরাহ, পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতেও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
সম্প্রতি বন্ধ থাকা জাতীয় জুট মিল পরিদর্শন করেন সরকারের দুই মন্ত্রী। এ সময় বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলম জানান, বন্ধ পাটকলগুলো বেসরকারি খাতে চালুর উদ্যোগের অংশ হিসেবে জাতীয় জুট মিলও পুনরায় চালু করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বন্ধ মিল-কারখানা চালুর সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবেই জাতীয় জুট মিলকে আবারও উৎপাদনে ফেরানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মিলটি চালু হলে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও গতি ফিরবে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, জাতীয় জুট মিলের চাকা আবার ঘুরলে প্রায় ৫ হাজার মানুষ সরাসরি কাজের সুযোগ পাবেন। এর পাশাপাশি পাটচাষি, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের আয়-রোজগারের সুযোগও বাড়বে।
স্থানীয়দের আশা, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে জাতীয় জুট মিল আবারও উৎপাদনে ফিরলে শুধু শ্রমিকদের কর্মসংস্থানই ফিরে আসবে না, বরং সিরাজগঞ্জের এই অঞ্চলের অর্থনীতিতেও নতুন গতি সঞ্চার হবে।