কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফাঁসিয়াখালীতে বদলে যাচ্ছে বনভূমির চিত্র। একসময় ন্যাড়া হয়ে যাওয়া পাহাড়ে ফিরেছে সবুজের সমারোহ। নতুন করে মাথা তুলেছে নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি। একই সঙ্গে বনে দেখা মিলছে এশিয়ান হাতি, বানর, শিয়ালসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর। বন রক্ষায় ধারাবাহিক অভিযান ও দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ফলে ফাঁসিয়াখালীতে বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
ফাঁসিয়াখালী বন বিভাগের বিট অফিস সূত্রে জানা গেছে, বিটের আওতাধীন রিজার্ভ বনভূমির পরিমাণ ২ হাজার ৯০৭ একর। এর মধ্যে প্রায় ২০ একর বনভূমি বিভিন্ন সময়ে জবরদখলে চলে গেছে। বিশাল এই বনাঞ্চল দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র পাঁচজন বনকর্মী। ফলে জনবল সংকটের মধ্যেই বন রক্ষা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করতে হচ্ছে তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বন বিভাগ সূত্র জানায়, ফাঁসিয়াখালী উত্তর বন বিভাগের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং বিট। দীর্ঘদিন ধরে এখানে বনভূমি দখল, কাঠ পাচার, বালু উত্তোলনসহ নানা ধরনের বন অপরাধের অভিযোগ ছিল। তবে বিট কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার খসরুল আমিন দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। কমেছে জবরদখল, কাঠ পাচার, বালু উত্তোলনসহ বনের ওপর নানা ধরনের চাপ।
গত দুই বছরে খসরুল আমিনের নেতৃত্বে ফাঁসিয়াখালী বিটে ৫০টির বেশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। একাধিকবার অভিযান চালিয়ে সরানো হয়েছে করাতকল (স’মিল)। পাশাপাশি ১০টি বালুমহালে অভিযান পরিচালনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফাঁসিয়াখালী বিটে বন অপরাধের ঘটনায় ২৮টি মামলা করা হয়। পরবর্তী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২টিতে।
ফাঁসিয়াখালী বিট কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার খসরুল আমিন বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর বনভূমি রক্ষা ও বন অপরাধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে তিনি চার থেকে পাঁচবার হামলার শিকার হয়েছেন। মোবাইল ফোনে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এমনকি অপরাধীদের পক্ষ থেকে ফৌজদারি মামলার মুখোমুখিও হতে হয়েছে। তারপরও বন রক্ষার দায়িত্ব পালনে তিনি কখনো পিছপা হননি।
ফাঁসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে গর্জন, সেগুন, তেলসুর, ঢাকিজামসহ বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা বৃক্ষের পাশাপাশি রয়েছে বিভিন্ন সৃজিত বাগান। নানা প্রজাতির পাখির কলকাকলিতে প্রতিনিয়ত প্রাণবন্ত থাকে বনাঞ্চলটি। পাশাপাশি বুনোহাতিও কখনো একা, আবার কখনো দলবেঁধে বনের ভেতর বিচরণ করে।
তবে অভয়ারণ্যের আশপাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন মানববসতির কারণে বনজ সম্পদের ওপর স্থানীয় মানুষের নির্ভরতা রয়েছে। অনেকেই জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে বন থেকে বিভিন্ন ধরনের সম্পদ আহরণ করেন। এতে বন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ এবং বননির্ভর মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে বনজ সম্পদের ওপর চাপ কমবে। একই সঙ্গে নিরাপদ হবে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল।
বর্তমানে ফাঁসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বন সংরক্ষণে সম্পৃক্ত করে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গেলে বন রক্ষার পাশাপাশি ফাঁসিয়াখালীর সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যও দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. কামরুল হাসান জানান, সরকারের ২৫ কোটি গাছ রোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়নে বন বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ফাঁসিয়াখালীতে বর্তমানে ৩০ হেক্টর বাগানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বনভূমি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি হারিয়ে যাওয়া জীববৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা এবং প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য বজায় রাখাই এ কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য।
বন বিভাগ ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ধারাবাহিক সংরক্ষণ কার্যক্রম, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ফাঁসিয়াখালীর বনভূমি আরও সমৃদ্ধ হবে। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে এ বনাঞ্চল আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।