কালভার্ট আছে, কিন্তু ওঠার রাস্তা নেই। চার মাস আগে খালের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে আরসিসি বক্স কালভার্ট। অথচ দুই পাশে সংযোগ সড়ক না থাকায় সেটি এখনো পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছেন না স্থানীয়রা। ফলে প্রতিদিন কোমরপানি পেরিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে পাঁচ গ্রামের প্রায় দেড় হাজার মানুষকে।
বর্ষা মৌসুমে পানি বেড়ে যাওয়ায় দুর্ভোগ আরও চরমে উঠেছে। স্কুলশিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পানির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। নারী, শিশু ও বয়স্কদের পা পিছলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকছে প্রতিনিয়ত। কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ারও কোনো নিরাপদ ব্যবস্থা নেই।
বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার রাড়ীপাড়া ইউনিয়নের কাকার বিল এলাকায় সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, মধ্যম তেলিগাতি-মালমগাছা-ব্রাহ্মণকাঠি-কাকারবিল সড়কে বক্স কালভার্টটি নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ২৮ লাখ ২৯ হাজার ৮০১ টাকা ১৯ পয়সা।
স্থানীয়রা জানান, বৌ-বাজার থেকে চুচড়ামারি খাল পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশে কালভার্টটি নির্মাণ করা হলেও দুই পাশে এখনো সংযোগ সড়ক তৈরি হয়নি। ফলে নির্মাণের চার মাস পরও কালভার্টটি কার্যত কোনো কাজে আসছে না।
কাকার বিল, খাড়াসম্বল, চুচড়ামারি, মালমগাছা, ঢুলিগাতী ও বৈলতলীসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ এ পথ ব্যবহার করেন। প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় হাজার মানুষ এ পথে চলাচল করেন বলে স্থানীয়দের দাবি। একই এলাকায় রয়েছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মসজিদ।
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তানিশা বলে, ‘প্রতিদিন স্কুলে যেতে হয়। কালভার্ট তৈরি হলেও আমরা উঠতে পারি না। পাশের খাল পার হয়ে যেতে হয়। মা আমাকে প্রতিদিন স্কুলে নিয়ে যান এবং নিয়ে আসেন। দ্রুত রাস্তা সংস্কার করে কালভার্টের দুই পাশে বালু দিয়ে ভরাট করে ওঠার ব্যবস্থা করা হলে আমরা সহজে স্কুলে যেতে পারতাম।’
শিক্ষার্থীদের অভিভাবক সাবিনা আক্তার বলেন, ‘আমার দুই ছেলে-মেয়ে স্কুলে পড়ে। একজনকে সকাল ৯টায় স্কুলে দিয়ে আসতে হয়, আরেকজনকে দুপুর ১২টায়। দিনে চারবার আমাকে এই পানির মধ্য দিয়ে যাওয়া-আসা করতে হয়। কিছুদিন আগে এখান থেকে পড়ে গিয়ে সন্তানের বইও পানিতে ভিজে গেছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা মনিরা বেগম বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে রাস্তার অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। কালভার্ট থাকলেও মানুষ সেটি দিয়ে ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারে না। নারী ও শিশুদের সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে।’
জাকির হোসেন বলেন, ‘এই কালভার্ট দিয়ে পাঁচ গ্রামের মানুষ চলাচল করে। প্রতিদিন প্রায় এক থেকে দেড় হাজার মানুষকে পানিতে ভিজে যাতায়াত করতে হয়। বাজারে যেতে হলেও এই কালভার্ট পার হতে হয়। নির্মাণের প্রায় চার মাস হয়ে গেলেও ঠিকাদারকে বারবার বলেও কোনো কাজ হচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘এখানে কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ারও কোনো নিরাপদ ব্যবস্থা নেই। পানির মধ্য দিয়ে মানুষকে কোলে বা ধরে নিয়ে যেতে হয়। বর্ষার সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।’
স্থানীয় বৃদ্ধ আব্দুস সালাম মোল্লা বলেন, ‘আমাদের বয়স হয়েছে, পানির মধ্যে দিয়ে হাঁটতে খুব কষ্ট হয়। পা পিছলে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। অসুস্থ হলে বাড়ি থেকে বের হওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। ডাক্তার দেখাতে বা হাসপাতালে যেতে হলে এই পানি পার হয়েই যেতে হয়।’
স্থানীয় বাসিন্দা জামাল তালুকদার বলেন, ‘কালভার্ট নির্মাণ হয়েছে, কিন্তু রাস্তা না থাকায় মানুষের কোনো উপকার হচ্ছে না। বরং বর্ষায় শিশুরা পানির মধ্যে দিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। দ্রুত মাটি ফেলে দুই পাশের রাস্তা উঁচু করা দরকার।’
রাড়ীপাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর কাকার বিল ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মনি শিকদার বলেন, ‘তিন-চার মাস আগে খালের ওপর কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। এরপর ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে গেছেন। কালভার্টের দুই পাশে মাটি দেওয়া হয়নি, বিকল্প রাস্তাও নেই। প্রতিদিন দেড় হাজারের মতো মানুষ এ পথ দিয়ে চলাচল করে। এখানে স্কুল ও মসজিদ রয়েছে। ছোট ছোট শিশুরা পানির মধ্যে দিয়ে স্কুলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, কালভার্ট নির্মাণের সময় পর্যাপ্ত বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও দুর্ভোগ কমেনি। বরং বর্ষায় পানি বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। জরুরি রোগী, গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্কদের চলাচলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হচ্ছে।
তবে ঠিকাদার মো. জালাল খান বলেন, ‘আমি ঢাকায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় কাজে কিছুটা দেরি হয়েছে। দ্রুত বাগেরহাট গিয়ে কাজটি শেষ করে দেব। নতুন করে রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে। রাস্তার কাজ শেষ হলেই আমরা মাটি দেওয়ার ব্যবস্থা করব। এছাড়া কিছুদিনের মধ্যে গ্রামবাসী ও শিক্ষার্থীদের চলাচলের জন্য একটি সাঁকো নির্মাণ করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, সাঁকো নির্মাণের পর সেখান থেকে মাটি এনে কালভার্টের দুই পাশে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
বাগেরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মঞ্জুর রশিদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।